28/08/2024
"-কি এত গুনগুন করে পড়ছিস? চিৎকার করে পড়। আমি যেন রান্না ঘর থেকে তোদের পড়ার আওয়াজ পাই।" মায়ের এমন ধমকে আমরা দুই ভাই চিৎকার করেই পড়তাম। পড়া হয়ে গেলে যেই মা'কে বলতাম,
"-মা,পড়া হয়ে গেছে। পড়া ধরবে তো?
তখন মা বলতো,
"-যা পড়েছিস সব খাতায় লেখ। আমি শুধু লেখাটাই দেখব।"
পাতা ভর্তি করে খাতায় লিখে ফেলতাম। আর মা শুধু খাতায় চোখটা বুলিয়ে নিয়ে বলত,
"-পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে লিখতে হবে। খাতায় কাটাকুটি করা যাবে না। আরও ভালো করে লেখার চেষ্টা কর...।"
তখন একটা কথাই বুঝতাম কি বাংলা, কি অংক বা ইংরাজী.. মা সব বিষয়েই পারদর্শী। ভাবতাম, মা এত কিছু জানে কি করে?
আসলে মায়ের ছিল কড়া শাসন। তাই মায়ের কথাই শেষ কথা, সেখানে আমাদের দুই ভাইয়ের পছন্দ অপছন্দ খুব একটা মূল্য পেত না। হাজার বাহানা করেও কিছু চাইলেও সেটা পাওয়া ছিল দূর অস্ত। বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে মা-ই হয়ে উঠেছিল আমাদের সর্বেসর্বা। সব কিছুই যেন নিয়মে বাঁধা। তাই মাঝে মধ্যে মায়ের উপর ভীষণ রাগ হতো। শাসনের চাপে পড়ে খুব অতিষ্ঠ হয়ে উঠতাম। মায়ের হাত মারও খেয়েছি।
সে যাই হোক, বড়ো হয়েছি কলেজ, ইউনিভার্সিটি কমপ্লিট করেছি মায়ের শাসনে থেকেই। শাসনের মধ্যে থেকেই পেয়েছি অনেক স্বাধীনতা। আজ বুঝি এই শাসনের কত মূল্য। মোটের ওপর আজ আমরা দুই ভাই-ই প্রতিষ্ঠিত। ভাই ডাক্তার, আর আমি গভর্নমেন্ট স্কুলে শিক্ষকতা করি।
তারপর থেকে কেটেছে জীবনের অনেক গুলো দিন। হিসেবের খাতা বলে প্রায় পঁচিশ বছর। পঁচিশ বছর পরের ঘটনা। আজ মাধ্যমিকের রেজাল্ট। সকাল থেকেই আমরা বাড়ির সকলেই বেশ টেনশনে আছি। রেজাল্ট বের হবার দিন গুলো বড়ো টেনশনের দিন। আমার ভাইও বার বার ফোন করে খবর নিচ্ছে। আমার স্ত্রী অনিন্দিতা আমাকে জিজ্ঞেস করছে বার বার,
"-কি গো, রেজাল্টের কিছু খবর পেলে?"
"-খবর পেলে তুমি তো জানতেই। তবে এখনো কোনো খবর পাইনি।"
অনিন্দিতা নিজেও টেনশনে আছে। চাপা ভয় মিশ্রিত কণ্ঠে নিজের মনেই বলে উঠল,
"সকাল দশটার পর তো ওয়েব সাইটে রেজাল্ট দিয়ে দেওয়ার কথা। কেন যে এত দেরি হচ্ছে!"
কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বলল,
"-এই জানো আমার না খুব ভয় করছে।"
বললাম,"সে তো আমারও। নিজের রেজাল্ট নিয়ে এত টেনশন হয়নি।
হঠাৎ মোবাইলটার রিং বেজে উঠল। দেখি আমার ভাইয়ের ফোন। ভাইয়ের ফোন রিসিভ করেই জিজ্ঞেস করলাম,
"-রেজাল্টের খবর পেলি?"
"-দাদা ভীষণ আনন্দ হচ্ছে। আজ যে আমার কতটা আনন্দ হচ্ছে তোকে বলে বোঝাতে পারব না। ফার্স্ট ডিভিশন একে বারে।
"-বলিস কি রে।"
"-হ্যাঁ দাদা,জীবনে এত বড়ো আনন্দের খবর আমি আগে কখনো পাইনি। মা ফার্স্ট ডিভিশন পেয়েছে। ভাবতে পারছিস এটা কত বড়ো খুশির খবর?
মা ততক্ষণে পুজো সেরে ঠাকুর ঘর থেকে বেরিয়ে এসে আমার হাতে প্রসাদটা দিয়ে বলল,
"-এসবই তোদের কৃতিত্ব রে বাবা। আমি আর কি করলাম! আমার অপূর্ণ সাধ তোরা আজ পূরণ করেছিস। ছোটো বেলায় তোরা যখন পড়া শোনা করতিস তখন তোদের পড়ানো বা খাতায় তোরা যা লিখতিস সেটা দেখার মতো যোগ্যতাই আমার ছিল না। শুধু ভাবতাম আমি যা পারিনি, আমার দুই ছেলে যেন তা করে দেখায়। আজ তোদের কৃতিত্বে আমি আমি ভীষণ খুশি। তোরাই আমার গর্ব। আর আজ এই যে ফার্স্ট ডিভিশনে পাশ করলাম তার সবটুকু কৃতিত্ব তো বৌমার। বৌমা যেভাবে আমার পড়াশোনা নিয়ে নিরলস চেষ্টা চালিয়ে গেছে তাতেই আমার সে সাধ পূর্ণ হয়েছে। জীবনে এমন একটা দিদিমণি পেয়েছি, আমি তো নিজেকে খুব লাকি মনে করি। মেয়েটা কতটা ধৈর্য্য নিয়ে পড়িয়েছে। যখন বলতাম এটা আমার দ্বারা হবে না, তখন বলত, মানুষ পারে না এমন কিছু নেই। আর এই সব টুকুই তোদেরই অবদান।"
মা'কে প্রণাম করে বললাম,
"-না মা তোমার শিক্ষা না থাকলে তা কি করে সম্ভব হতো? সন্তান দের মানুষ করার পিছনে মায়ের ভূমিকাই যে সব থেকে বড়ো কথা। জন্মের পর সেই প্রথম আলো দেখানোর দিন থেকেই যে শুরু হয়ে যায় যে সে শিক্ষা যা পুঁথিগত শিক্ষার থেকেও অনেক বড়ো। আমাদের এই দুই ভাই বড়ো হওয়ার পিছনে শিক্ষাগত যোগ্যতার যত সার্টিফিকেট আছে, এগুলো তো সব তোমারই প্রাপ্য। তুমি তো মানুষ হতে শিখিয়েছো আমাদের। তুমিই বড়ো শিক্ষিকা। আমাদের জীবন পথে পাথেয় হয়ে থাকবে মায়ের শিক্ষা, সব থেকে বড়ো কথা এই মানুষ হওয়ার শিক্ষা।"
-:সমাপ্ত:-
কলমে:সরজিৎ ঘোষ।