06/02/2025
চেসেজু | নাগাল্যান্ডের রাজধানী কোহিমার থেকে দূরত্ব মাত্র ৫০ কিলোমিটার | গ্রামের চারিদিক সবুজে ঘেরা, মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে উঁচু নীচু বেশ কয়েকটা টিলা | ভেজু সুয়োরো এই গ্রামেরই বাসিন্দা | বয়স প্রায় ৯৫ | অশীতিপর বৃদ্ধের শরীর প্রায় ভেঙেই পড়েছে | দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ , স্বাভাবিক ভাবে হাঁটতে চলতেও পারেন না | এরই মাঝে বৃদ্ধ মানুষটি হারিয়ে যান প্রায় ৭৭ বছর আগের কথায় | স্মৃতি বেইমানি করেনি তাঁর সঙ্গে | মনের মাঝে আজও ভেসে ওঠে তার "বন্ধু"র স্মৃতি | আজও যে তিনি খুঁজেই চলেছেন তার সেই বন্ধুকে | চেসেজু গ্রামকে বদলে যেতে দেখেছেন ভেজু সুয়োরো | দেখেছেন দেশের স্বাধীনতা | দেখেছেন বহু উত্থান পতন | কিন্তু তিনি আর খুঁজে পাননি তার সেই বন্ধুকে | মন ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে ভেজু সুয়োরো-র | চোখের কোণায় চিকচিক করছে জল | এরই মাঝে বৃদ্ধ মানুষটি হারিয়ে যান প্রায় ৭৭ বছর আগের কথায়......
১৯৪৪ সাল | চেসেজু গ্রামের উপর দিয়ে প্রায়ই পাক খাচ্ছে ব্রিটিশ যুদ্ধবিমান | মাটি খুঁড়তে খুঁড়তে সেই দিকে তাকিয়ে আছেন ১৬ বছরের ভেজু সুয়োরো | হঠাৎ ভেজু সুয়োরো লক্ষ্য করলেন তারা যেখানে কাজ করছিলেন সেই জায়গার উপর থেকে এক ব্রিটিশ যুদ্ধবিমান অত্যন্ত দ্রুত গতিতে পাক খেয়ে বেরিয়ে গেল | মুহূর্তের অপেক্ষা | আবার আরেকটি যুদ্ধবিমান হানা দিল ওই একই জায়গায় | এই যুদ্ধবিমানটি প্রায় নেমেই এসেছিল মাটির কাছাকাছি | যুদ্ধবিমানের ভয়ঙ্কর আওয়াজে ভেজু সুয়োরো রীতিমতো ভয় পেয়ে যান | কিন্তু এই অবস্থাতেও ভেজু সুয়োরো-র বন্ধু অবিচলিত, যেন কিছুই হয়নি | বন্ধুটি সুদর্শন, পরনে সামরিক পোশাক, চোখে চশমা আর মনে দুর্বার সাহস | তাঁর লক্ষ্য একটাই- দিল্লি চলো। ব্রিটিশদের শেকল থেকে ভারতকে মুক্ত করতেই হবে | তিনি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু.....
তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা চলছে | সুভাষ তখন ব্রিটিশদের ত্রাস | দেশকে স্বাধীন করার লক্ষ্যে বার্মা হয়ে নেতাজি ঢুকেছেন ভারতের সীমানায়। তারপর জেসামি,ফেক,রুনগুজু অতিক্রম করে তিনি পৌঁছান চেসেজু গ্রামে | শহরের থেকে বেশ খানিকটা দূরত্ব অবস্থান করায় এবং টিলা দিয়ে ঘেরা থাকায় এই গ্রামটিতেই আজাদ হিন্দ বাহিনীর ক্যাম্প গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন নেতাজি | ১৯৪৪ সালের ৪ এপ্রিল থেকে মে পর্যন্ত প্রায় দুই মাস তিনি এই গ্রামেই ছিলেন | ভেজু সুয়োরো-র আজও মনে পড়ে যায় নেতাজিকে প্রথম দেখার কথা | আজাদ হিন্দ বাহিনীর সেনা পরিবেষ্টিত নেতাজি ঘোড়ায় চড়ে গ্রামে প্রবেশ করেছিলেন | নেতাজির সঙ্গে ছিল দুটো হ্যান্ড গ্রেনেড, একটি পিস্তল এবং একটি তলোয়ার |
© অহর্নিশ
চেসেজু গ্রামে নেতাজি সফি ডিজুখু (বর্তমানে নেতাজি ক্যাম্প) নামের ক্যাম্পে থাকতে লাগলেন | আর আজাদ হিন্দ বাহিনীর বাকি সৈন্যরা থাকতে লাগলেন ইন্সপেকশন বাংলোয় | চেসেজু গ্রামের লোকেরা তখন নেতাজিকে জাপানের সেনানায়ক ভাবতেন | অনেকেই তাঁকে জাপানের রাজা বলে সম্বোধন করতেন | নেতাজি বুঝেছিলেন গ্রামবাসীদের মন থেকে এই ভাবনা দূর করা ভীষণ জরুরি | কারণ গ্রামবাসীদের সাহায্য ছাড়া তাদের লড়াই করা সম্ভব নয় | কিছুদিনের মধ্যেই তিনি গ্রামের মানুষদের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তুললেন | ভেজু সুয়োরো-র আজও মনে পড়ে যায় গ্রামবাসীদের নেতাজি বলেছিলেন যুদ্ধে জয়লাভ করার পর তিনি গ্রামে পাকা রাস্তা,স্কুল, হাসপাতাল গড়ে দেবেন | কৃষিকাজের উন্নতির জন্যে তিনি ধান কল গড়ে দেবেন, ব্যবস্থা করে দেবেন উন্নতমানের যন্ত্রপাতির | কিন্তু এর বিনিময়ে এখন আজাদ হিন্দ বাহিনীর সৈনিকদের দুবেলা খাবারের দায়িত্ব নিতে হবে গ্রামবাসীদের |
চেসেজু গ্রামের লোকেরা নেতাজির পাশে এসে দাঁড়ালেন | এমন প্রেক্ষাপটেই ক্যাম্পে গিয়ে ভেজু সুয়োরো আলাপ করলেন সুদর্শন নেতাজির সঙ্গে। ভেজু সুয়োরো নেতাজিকে সাহা(সাহেব) বলে সম্বোধন করতেন | কিন্তু সমস্যা দেখা দিল অন্য জায়গায় | সুভাষচন্দ্র বসু তো নাগাল্যান্ডের ওই গ্রামবাসীদের ভাষা জানতেন না । আর ভেজু সুয়োরোও অন্য কোনো ভাষা জানতেন না | কাজেই উপায় ? তারা সংকেতের মাধ্যমে কথা বলতে লাগলেন | ভেজু সুয়োরোর আজও মনে পড়ে যায় নেতাজি মুরগির গলার আওয়াজ নকল করে তাকে "মুরগির ঝোল" বানানোর জন্যে অনুরোধ করেছিলেন | ওই গ্রামে নেতাজি যতদিন ছিলেন, ভেজু সুয়োরো প্রতিদিন নেতাজির জন্যে ভাত আর মুরগির ঝোল বানিয়ে নিয়ে যেতেন | ফলের মধ্যে নিয়ে যেতেন আমলকি | ভেজু সুয়োরোর আজও মনে পড়ে যায় যতবার তিনি নেতাজিকে খাবার দিয়েছেন, নেতাজি সেই খাবার থেকে সবার প্রথমে তাকে খেতে বলতেন আর তারপরে নিজে সেই খাবার মুখে তুলতেন |
© অহর্নিশ
এইভাবেই নেতাজির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বেড়ে ওঠে ভেজু সুয়োরোর | দুজনে একসাথে গ্রামে ঘুরে বেড়াতেন | গ্রামের পুরুষেরা কৃষিকাজ করছে, মহিলারা তাদের সন্তানদের জন্যে নিজে হাতে পোশাক বুনছেন - এই দৃশ্য বারবার মুগ্ধ করত নেতাজিকে | দুজনে প্রায়ই সুঁথোকা পিক ( বর্তমান নাম নেতাজি পিক)-এ উঠতেন | সুঁথোকা পিক থেকে আশেপাশের তিরিশটি গ্রামকে দেখা যায় | নেতাজি নিজের দূরবীন দিয়ে আশেপাশের গ্রামগুলিকে দেখতেন | সন্ধ্যা হয়ে এলে ভেজু সুয়োরো ফিরে যেতেন নিজের গ্রামে আর নেতাজি ফিরে যেতেন নিজের ক্যাম্পে |
কিন্তু নেতাজি ও আজাদ হিন্দ বাহিনীর সৈন্যরা চেসেজু গ্রামে অবস্থান করছেন এই খবর পৌঁছে যায় ব্রিটিশদের কাছে | এই কারণেই চেসেজু গ্রামে হানা দেয় ব্রিটিশ যুদ্ধবিমান | আতঙ্কিত হয়ে ভেজু সুয়োরো গ্রাম ছাড়েন | সেদিনই ব্রিটিশ সেনাবাহিনী গ্রাম ঘেরাও করে | শুরু হয় আজাদ হিন্দ বাহিনী এবং ব্রিটিশদের যুদ্ধ | যুদ্ধ চলে বহু ঘন্টা | এই ঘটনার কিছুদিন পরে ভেজু সুয়োরো এবং তার বেশ কিছু বন্ধু আবার গ্রামে প্রবেশ করে | আজাদ হিন্দ বাহিনীর সেনাদের ক্যাম্পে পৌঁছে তিনি দেখেন দুইজন বাঙালি সেনার মৃতদেহ পড়ে রয়েছে | ভেজু সুয়োরো এরপর পৌঁছান নেতাজির ক্যাম্পে, সেখানে গিয়ে তিনি দেখেন ক্যাম্পটির আর বিন্দুমাত্র কিছু অবশিষ্ট নেই | পুরো গুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে ক্যাম্প | বিস্ফোরণে জ্বলে গিয়েছে আশেপাশের সমস্ত গাছপালা | কিন্তু অবাক করার মত ঘটনা হল, কোথাও কোনও মৃতদেহ নেই | খটকা লাগে ভেজু সুয়োরো-র | কোথায় গেলেন নেতাজি | কিন্তু কোথাও খুঁজে পেলেন না তাঁকে.....
নেতাজির ক্যাম্পের পিছনে দুটি পুকুর ছিল | আজাদ হিন্দ বাহিনীর সৈনিকরা এবং গ্রামবাসীরা একটি পুকুর ব্যবহার করতেন | আরেকটি পুকুর ব্যবহার করতেন নেতাজি | ভেজু সুয়োরো এবং তার বন্ধুরা কিছুদিন পর সেই পুকুরের পাশে আসেন | সেখানে গিয়ে পুকুর থেকে জল তুলে খেতে গিয়ে দেখেন, সেই জল পানের অযোগ্য | কেমন একটা পচা পচা গন্ধ | কিন্তু এর কারণ তখন তারা বুঝতে পারেননি | কয়েকদিন পর আবার তারা ওখানে যান, একটু খোঁজাখুঁজি করতে গিয়ে দেখেন পুকুরের পাড়ে পাথর চাপা দিয়ে রাখা রয়েছে সারি সারি আজাদ হিন্দ বাহিনীর সৈনিকদের মৃতদেহ | অনেক সৈনিকদের মৃতদেহের সঙ্গে বাঁধা রয়েছে বম্ব | এই দেখে ভয় পেয়ে যান ভেজু সুয়োরো এবং তার বন্ধুরা | দীর্ঘ এক বছর তারা ওই পুকুরের ধারেপাশে যাননি | ধীরে ধীরে পচে যেতে থাকে মৃতদেহগুলি | প্রায় এক বছর পর যখন ভেজু সুয়োরো সেখানে যান, শুধু কঙ্কাল ছাড়া আর কিছু অবশিষ্ট ছিল না | এরপর থেকেই গ্রামবাসীরা ওই পুকুরটিকে সংরক্ষণ করেন | আজও ওই গ্রামে আসেন নেতাজি অনুরাগীরা |
আজ সেই ঘটনার প্রায় ৭৭ বছর অতিক্রান্ত | ভেজু সুয়োরো আজও ভুলতে পারেননি তার সেই বন্ধুকে | স্বপ্ন দেখেন একদিন আবার তাদের দেখা হবে.....
© অহর্নিশ
তথ্য - Article written by: Asonuo, NE, RNU AIR Kohima / AirPics: Asonuo
=========
তিনি কি আদৌ অধ্যাপক ওটেনকে প্রহার করেছিলেন? প্রদর্শিত গাড়িটি কি গৃহত্যাগের সঙ্গে যুক্ত ? নেতাজি ফাইলে স্পষ্ট এমিলি, অ্যানিটা নেতাজির কেউ নয় তবু কেন অপ্রচার ? বিমান দুর্ঘটনাই হয়নি তবু চিতাভস্মের গল্প কেন? রাশিয়ায় নেতাজি হত্যার কোনাে প্রমাণ নেই তবু হইচই কেন? ফরমােজা থেকে ফৈজাবাদ—এত প্রমাণ তবু বারংবার মৃত্যু পরােয়ানা কেন? আজাদি অর্থসম্পদ লুঠ হল কেন? কেন প্রকাশ্যে এলেন না অখন্ড ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী? নেতাজি নিয়ে এমন নানা বিভ্রান্তির উত্তর—নেতাজি গবেষক ডক্টর জয়ন্ত চৌধুরীর বই ‘ক্ষমা করাে সুভাষ ' স্বাধীনতার সূর্যসারথি বাংলার বড় আপনজন সুভাষ’কে সর্বভারতীয় স্তরে উপযুক্ত প্রাপ্য মর্যাদা দেওয়া হয়নি আজও। নেপথ্যে রয়েছে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি, প্রাদেশিকতা, আর্থিক লেনদেনের কলঙ্কময় গােপন রসায়ন।
তার সৌরদীপ্ত দেশপ্রেম, পবিত্র চরিত্র ও জীবনগাথাকে আড়াল করতে নানা অপচেষ্টা এবং নানাস্তরে গভীর চক্রান্ত চলেছে দিনের পর দিন। এ ব্যাপারে সম্প্রতি পরিবর্তনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। নতুন প্রজন্ম যুক্তি, তর্কও তথ্যের আলােয় নেতাজি সম্পর্কে সত্য জানতে এগিয়ে আসছে। তাদের সেই স্বপ্নপূরণের তাগিদে লেখকের এই নিবেদিত অর্ঘ্য নেতাজির প্রতি 'ক্ষমা করাে সুভাষ।। সত্যের সূর্যস্নাত যে পথে সুভাষচন্দ্রকে খুঁজে পাবে আজ ও আগামী।
আমাজন লিংক : https://amzn.to/48VG7Se
====================
"কিছু সময় পরে , তুমি হয়তো একটি আশ্চর্য এবং ভয়ঙ্কর বিষাদের খবর শুনবে ; কিন্তু সে সব শুনে বিষাদগ্রস্ত হয়ো না , মুষড়ে পোড়ো না । আবার দেখা হবে । .......এসো পবিত্র !"
নেতাজির সাথে শেষ দেখায় এমনি নির্দেশ পেয়েছিলেন ড: পবিত্র মোহন রায় ।
[সূত্র : " নেতাজীর সিক্রেট সার্ভিস " - লেখক - ডঃ পবিত্র মোহন রায়]
আমরা কতজন জানি যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নেতাজীর সিক্রেট সার্ভিস টেক্কা দিত মিত্রশক্তির সিক্রেট সার্ভিসকে ? জানি না আমরা কারণ আমাদের জানতে দেওয়া হয়নি । আসল ইতিহাস জানতে গেলে পড়তেই হবে নেতাজীর আজাদ হিন্দের ইন্টেলিজেন্স অফিসার ড: পবিত্র মোহন রায়ের লেখা বই " নেতাজীর সিক্রেট সার্ভিস " ।
আমাজন লিংক : https://amzn.to/41ERsCj