13/05/2023
ঋণ গ্যারান্টারদের জন্য আর সহজে গা বাঁচানোর পথ নেই
দি বিজনেস স্যট্যান্ডার্ড ১২ মে ২০২৩
চলতি বছরের জানুয়ারিতে একটি আপিল নিষ্পত্তি করে আদালত রায় দেন যে গ্যারান্টররা রিট দায়ের করে নিলাম কার্যক্রম বন্ধ করতে পারবে না। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ রায়ে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, অর্থ ঋণ আদালত আইন-২০০৩ অনুযায়ী কোনো গ্যারান্টরের সম্পত্তি নিলামে তুলে ব্যাংকের পাওনা সমন্বয় করতে কোনো বাধা নেই।
এখন থেকে ব্যাংক বা অন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে কেউ ঋণ নিতে চাইলে তার গ্যারান্টর হওয়ার আগে দুবার ভেবে-চিন্তে সিদ্ধান্ত নেওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। কারণ গ্যারান্টররা আর মূল ঋণগ্রহীতাদের থেকে সম্পর্ক চিন্ন করে গা বাঁচাতে পারবে না। মূল ঋণগ্রহীতা খেলাপি হলে আদালতের স্থগিতাদেশকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সুদসহ পুরো ঋণ শোধের দায়ও এড়াতে পারবে না তারা।
কোনো ঋণগ্রহীতা ঋণ শোধে ব্যর্থ হলে তার গ্যারান্টরের সম্পত্তি নিলামে তোলার পথ পরিষ্কার হয়েছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের এক ঐতিহাসিক রায়ে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে একটি আপিল নিষ্পত্তি করে আদালত রায় দেন যে গ্যারান্টররা রিট দায়ের করে নিলাম কার্যক্রম বন্ধ করতে পারবে না। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ রায়ে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, অর্থ ঋণ আদালত আইন-২০০৩ অনুযায়ী কোনো গ্যারান্টরের সম্পত্তি নিলামে তুলে ব্যাংকের পাওনা সমন্বয় করতে কোনো বাধা নেই। সুপ্রিম কোর্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ৫ বছরে গ্যারান্টররা ১৩ হাজার ৬৪১টি রিট দায়ের করেছে তাদের সম্পত্তি নিলামে বিক্রি করে ব্যাংকের পাওনা সমন্বয় করার বিরুদ্ধে। এসব রিটের মধ্যে ৮০ শতাংশ আদেশ গেছে রিটকারীদের পক্ষে। দায়ের হওয়া রিটগুলোর সঙ্গে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার অনাদায়ী ঋণ জড়িত।
ব্যাংকাররা মনে করছেন, এ রায়ের ফলে তাদের খেলাপি ঋণ আদায়ের কার্যক্রম গতি পাবে।এবি ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ এ (রুমি) আলী দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, ঋণ ওঠানোর নিশ্চয়তা পাওয়ার জন্য আইন অনুযায়ী ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেওয়ার সময় গ্যারান্টর নিয়োগ করে। 'আপিল বিভাগের এই ঐতিহাসিক রায় সেই পথকে সুগম করল,' বলেন তিনি।মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান টিবিএসকে বলেন, আইন অনুযায়ী ঋণগ্রহীতা খেলাপি হলে গ্যারান্টরও খেলাপি হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়ে যায়।'অনেকেই সহজে গ্যারান্টর হয়ে যায়। কিন্তু এখন থেকে গ্যারান্টর হওয়ার আগে তারা ঋণ শোধের সামর্থ্য নিয়ে দুবার ভাববে। এতে ব্যাংকগুলোর জন্য ঋণ আদায় সহজ হবে,' বলেন তিনি।
বিভিন্ন মেশিনারিজ আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান একে আলী ট্রেডার্স ২০০৮ সালে অগ্রণী ব্যাংকের গাজীপুরের একটি শাখা থেকে ১১ কোটি টাকা ঋণ নেয়। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী আলী রেজা শাওন তার কিছু সম্পত্তি ব্যাংকের কাছে বন্ধক রাখার পাশাপাশি তার বন্ধু, ব্যবসায়ী দেওয়ান মুরাদ হোসেনকে ঋণের গ্যারান্টর করেন।কিন্তু ২০১১ সালে এই ঋণটি খেলাপি ঋণে পরিণত হয়। তখন একে আলী ট্রেডার্সের কাছে সুদ-আসলে ব্যাংকের পাওনা দাঁড়ায় ১৯ কোটি টাকা।
ব্যাংক এই খেলাপি ঋণ আদায়ে গাজীপুর অর্থ ঋণ আদলতে মামলা করে। ওই মামলায় আলী রেজা শাওনকে করা হয় মূল বিবাদী। পাশাপাশি গ্যারান্টর দেওয়ান মুরাদ হোসেনকেও বিবাদী করা হয়। ২০১৫ সালে আদালত এক রায়ে বন্ধক রাখা সম্পত্তি নিলামে তুলে বিক্রি করে ব্যাংকের পাওনা আদায়ের নির্দেশ দেন। এরপর ব্যাংক নিয়ম অনুযায়ী নিলাম ডাকে। কিন্তু কোনো বিডার না পেয়ে ঋণের বিপরীতে বন্ধক রাখা সম্পত্তি দখলে নেয় ব্যাংক। সেখান থেকে ব্যাংকের পাওনা টাকার মাত্র অর্ধেক উঠে আসে।এরপর ব্যাংক বাকি পাওনা আদায়ে নির্দেশনা চেয়ে জুন মাসে আবার আদালতে আবেদন করে। আদালত গ্যারান্টরের সম্পত্তি—একটি অটো রাইস মিল ও একটি রেস্ট হাউস—বিক্রি করে বাকি পাওনা টাকা আদায়ে ডিক্রি জারি করেন।
কিন্তু ওই নিলাম আদেশ স্থগিত করার জন্য গ্যারান্টর হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। ২০১৬ সালে হাইকোর্ট ওই নিলাম কার্যক্রমের ওপর ছয় মাসের স্থগিতাদেশ দেন।ওই বছরই ব্যাংক হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে লিভ-টু-আপিল দায়ের করলে আপিল বিভাগের চেম্বার জজ আদালত হাইকোর্টের আদেশ বহাল রাখেন এবং আপিলটি প্রধান বিচারিপতির নেততৃত্বাধীন পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে শুনানির জন্য পাঠিয়ে দেন। সেই আপিল এ বছরের জানুয়ারি মাসে নিষ্পত্তি করে আপিল বিভাগ হাইকোর্টের আদেশ বাতিল করে রায় ঘোষণা করেন। পূর্ণাঙ্গ রায়ে আদালত বলেন, অর্থ ঋণ আদালত আইন ২০০৩ অনুযায়ী কোনো গ্যারান্টরের সম্পত্তি নিলামে তুলে ব্যাংকের পাওনা সমন্বয় করতে কোনো বাধা নেই।
রায়ে বলা হয়, অর্থ ঋণ আদালত আইন ২০০৩-এর ৬(৫) ধারার ক্ষমতাবলে মূল ঋণগ্রহীতা ঋণখেলাপি হলে আর্থিক প্রতিষ্ঠান ওই ঋণের গ্যারান্টরের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারবে। এতে বলা হয়, আদালতের দেওয়া রায়, আদেশ বা ডিক্রি সব বিবাদীর বিরুদ্ধে যৌথভাবে ও পৃথক পৃথকভাবে কার্যকর হবে। ডিক্রি জারির মাধ্যমে দাবি আদায়ের ক্ষেত্রে আদালত প্রথমে মূল খেলাপির সম্পত্তি এবং তারপর যতটা সম্ভব গ্যারান্টরের সম্পত্তি সংযুক্ত করবেন বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।তবে গ্যারান্টর যদি বাদীর পক্ষে ডিক্রির দাবি পরিশোধ করে, তবে উল্লিখিত ডিক্রি যথাক্রমে তাদের অনুকূলে স্থানান্তর করা হবে এবং তারা খেলাপির বিরুদ্ধে সেটি প্রয়োগ করতে পারবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে রায়ে।
আপিল বিভাগ রায়ের পর্যবেক্ষণে বলেন, এরকম বিষয়ে অনেকসময় হাইকোর্টকে ভুল বুঝিয়ে গ্যারান্টর বা ঋণ খেলাপিরা নিজেদের পক্ষে আদেশ নেয়। আর হাইকোর্ট অনেকসময় আইনের 'মূল স্পিরিট' বুঝতে ব্যর্থ হন।এরকম বিষয়ে রিট হলে হাইকোর্টকে সাবধানতার সঙ্গে বিচারকাজ পরিচালনার জন্য নির্দেশনা দিয়েছেন আপিল বিভাগ।