22/10/2019
নিরীক্ষা/অডিটঃ
নিরীক্ষা (অডিটিং) আর্থিক কাজকর্ম ও ঘটনাবলী সম্পর্কে নিয়মানুগ পন্থায় নিরপেক্ষ মূল্যায়ন- যার লক্ষ্য হচ্ছে বিদ্যমান নীতিমালা ও সম্পাদিত কাজকর্মের মধ্যে কতটুকু সঙ্গতি রয়েছে সে সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া। নিরীক্ষা কোন প্রতিষ্ঠানের আর্থিক বিবরণী ও সে সম্পর্কিত অন্যান্য তথ্যের পরীক্ষা মাত্র এবং এ পরীক্ষার ফলাফল বিশেষ মতামত হিসেবে সংশ্লিষ্ট পক্ষের নিকট প্রদান করা হয়। বাংলাদেশে ১৯৯৪ সালের কোম্পানি আইনের অধীনে রেজিস্ট্রিকৃত কোম্পানির হিসাব নিরীক্ষা বাধ্যতামূলক। ২১৩ (৩) ধারা অনুযায়ী নিরীক্ষককে বার্ষিক সাধারণ সভায় পরীক্ষিত হিসাব-সম্পর্কিত মতামত প্রদান করতে হয়।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড একাউন্ট্যান্টস ইনস্টিটিউট কর্তৃক আন্তর্জাতিক নিরীক্ষামান গ্রহণের পূর্বে নিরীক্ষার দুটি প্রধান উদ্দেশ্য ছিল: ১. হিসাবে ভুল-ভ্রান্তি ও দুর্নীতি নির্ধারণ ২. ভুল-ভ্রান্তি ও দুর্নীতি সংঘটন বন্ধকরণ। বর্তমানে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক নিরীক্ষা মান অনুসরণ করা হয় এবং নিরীক্ষা পেশা কতকগুলি আইন কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত হয়, যেমন- ১৯৯৪ সালের কোম্পানি আইন, ১৯৯১ সালের ব্যাংকিং কোম্পানি আইন, ১৯৩৮ সালের বীমা আইন, ১৯৯৩ সালের সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন, ১৯৮৭ সালের সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ রুলস, ১৯৭৮ সালের বৈদেশিক অনুদান নিয়ন্ত্রণ রুলস এবং ১৯৮৪ সালের কো-অপারেটিভ সোসাইটি অধ্যাদেশ।
বাংলাদেশের সংবিধানের ১২৮ ধারা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের হিসাব নিরীক্ষার দায়িত্ব সিঅ্যান্ডএজি-কে প্রদান করেছে। সিঅ্যান্ডএজি-কে সংসদে প্রতিবেদন জমা দিতে হয়। প্রজাতন্ত্রের ও কোর্ট অব ল’-এর হিসাব, অন্যান্য কর্তৃপক্ষ ও সরকারি অফিসারদের হিসাব সিঅ্যান্ডএজি-কে নিরীক্ষা করতে হয়। এই উদ্দেশ্যে তার অথবা তার অনুমোদিত অন্য কোন প্রতিনিধির সকল হিসাব বই, ভাউচার, দলিল, নগদান, স্ট্যাম্প, সিকিউরিটিজ, গুদাম ও অন্যান্য সরকারি সম্পত্তি দেখার অধিকার আছে। কাজ চালানোর ক্ষেত্রে সিঅ্যান্ডএজি কোন ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষের অধীনস্থ নন। সংবিধান কর্তৃক প্রদত্ত ক্ষমতাবলে এবং অধীনস্থ দশজন ডাইরেক্টর জেনারেলের সহায়তায় তিনি সরকারি সকল বিভাগ, এজেন্সি, পাবলিক সেক্টর করপোরেশন এবং যে সকল পাবলিক কোম্পানিতে সরকারের ৫০% মালিকানা আছে তার নিরীক্ষা করে থাকেন।
সরকারি নিরীক্ষার উদ্দেশ্য হলো সরকারি ব্যবস্থাপনায় সম্পদ ব্যবহারের স্বচ্ছতা ও দায়িত্বের নিশ্চয়তা দান করা। এই উদ্দেশ্য সম্পাদনে নিরীক্ষায় অন্তর্ভুক্ত কাজগুলি হলো: হিসাব, আয়-ব্যয় বিবরণ সঠিকভাবে তৈরি করা হয়েছে কিনা তা যাচাই করা, নিরীক্ষিত প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনার যথার্থতা বিচার-বিবেচনা করা, প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ব্যবহারে কার্যকারিতা, দক্ষতা ও মিতব্যয়িতার নিশ্চয়তা প্রদান, সরকারি মালিকানার বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের উদ্বর্তপত্র ক্রয়-বিক্রয় হিসাব, উৎপাদন হিসাব, লাভ-ক্ষতি হিসাব ও সহকারি হিসাব বই পরীক্ষা করা এবং বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে কিনা জানার জন্য বিশেষ অনুসন্ধান কাজ সম্পাদন। সিঅ্যান্ডএজি-র অধীনে নিম্নলিখিত অডিট ডাইরেক্টরেট ও প্রশিক্ষণ একাডেমি ন্যস্ত করা হয়েছে:
বাণিজ্যিক নিরীক্ষা, পূর্ত নিরীক্ষা, বৈদেশিক সাহায্যাধীন প্রকল্প নিরীক্ষা, বেসামরিক নিরীক্ষা, রেলওয়ে নিরীক্ষা, ডাক, তার ও টেলিফোন নিরীক্ষা, প্রতিরক্ষা নিরীক্ষা, বৈদেশিক মিশন নিরীক্ষা, কৃতি নিরীক্ষা (performance audit) এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনা একাডেমি ( Financial Management Academy)।
উপর্যুক্ত বিভাগগুলির প্রধানকে ডাইরেক্টর জেনারেল বলা হয়। প্রতিটি বিভাগের নিজস্ব কাজের কাঠামো রয়েছে।
বাণিজ্যিক নিরীক্ষা অধিদপ্তর ১৯৫৬ সালে পাকিস্তান সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক বিবরণী নিরীক্ষার জন্য বাণিজ্যিক নিরীক্ষা অধিদপ্তরটি স্থাপন করা হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ব্যাংক ও শিল্প প্রতিষ্ঠানের রাষ্ট্রীয়করণের জন্য বাণিজ্যিক নিরীক্ষা বিভাগের কাজের পরিধি বহুলাংশে বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে এই অধিদপ্তর সকল স্বায়ত্তশাসিত ও আধাস্বায়ত্তশাসিত সরকারি প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকসহ ৫০% সরকারি মালিকানা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের হিসাব নিরীক্ষা করে। এই অধিদপ্তর যে সকল দায়িত্ব পালন করে থাকে তা হলো: সকল সরকারি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের প্রারম্ভিক ও চূড়ান্ত হিসাব নিরীক্ষা; স্বীকৃত হিসাববিজ্ঞান ও নিরীক্ষা শাস্ত্রের নীতি অনুযায়ী উক্ত প্রতিষ্ঠানের আর্থিক বিবরণীগুলি ঐ প্রতিষ্ঠানের শুদ্ধ ও সঠিক আর্থিক অবস্থা দেখাচ্ছে কি-না তা নির্ধারণ; বিধিবদ্ধ ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের সংক্ষিপ্ত হিসাব সহকারে সাধারণ আর্থিক বিবরণী প্রস্ত্তত করা; উপর্যুক্ত প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মূল্যায়ন এবং অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষণের অভ্যন্তরীণ ও বহিঃকাজের মূল্যায়ন করা; এবং সরকারি মালিকানাধীন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকান্ডের কার্যকারিতা, দক্ষতা ও মিতাচারিতা পরিমাপ করা।
নিরীক্ষার প্রকার, পদ্ধতি ও কার্যপ্রণালী নিরীক্ষাকে প্রধানত তিন ভাগে ভাগ করা হয়: যেমন, বিধিগত (রেগুলারিটি) অডিট, আর্থিক বিবরণী (ফাইনান্সিয়াল স্টেটমেন্ট) অডিট এবং কৃতি (পারফরমেন্স) অডিট। নিয়ম মাফিক নিরীক্ষা খুবই প্রথাগত। এর আওতায় প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন প্রাসঙ্গিক রীতিনীতি, আইন ও কার্যপ্রণালী মেনে চলেছে কিনা দেখার জন্য নিরীক্ষিত প্রতিষ্ঠানের প্রাপ্তি ও ব্যয়, আর্থিক ব্যবস্থা ও লেনদেনের পরীক্ষা করা হয়। আর্থিক বিবরণীর নিরীক্ষা হলো আর্থিক বিবরণীগুলি নিরীক্ষিত প্রতিষ্ঠানের গঠিত আর্থিক অবস্থা প্রদর্শন করছে কি-না সে সম্পর্কে মতামত দেওয়ার জন্য আর্থিক বিবরণীর পরীক্ষা করা। এই নিরীক্ষা সরকারি এবং সরকারি মালিকানার বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের বণ্টন ও আর্থিক হিসাবের নিরীক্ষাকেও অন্তর্ভুক্ত করে। কৃতি নিরীক্ষার উদ্দেশ্য হলো সম্পদ ব্যবহারে কার্যকর, দক্ষতা ও মিতব্যয় স্তর অর্জন করা হয়েছে কি-না তা দেখা। এ লক্ষ্যে কৃতি নিরীক্ষককে সংগঠনের কার্য পরিকল্পনা, কার্যকারিতা, ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি ও কার্যপ্রণালী পরীক্ষা করতে হয়। সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশে কিছু কিছু প্রতিষ্ঠানে কৃতি নিরীক্ষা শুরু হয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ অনিয়ম সম্বলিত অনুচ্ছেদগুলি প্রয়োজনীয় পরীক্ষার পর ‘অ্যাডভান্স প্যারা’ হিসেবে সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাপকের নিকট প্রেরণ করা হয়। নিরীক্ষিত প্রতিষ্ঠানকে জবাব দেওয়ার জন্য চার সপ্তাহ সময় দেওয়া হয়। জবাব পাওয়া না গেলে বা জবাব অসম্পূর্ণ হলে আরও দুই সপ্তাহের ব্যবধানে দুটি স্মারক দেওয়া হয়। চার সপ্তাহের সময় দিয়ে উক্ত অনুচ্ছেদ-সম্বলিত একটি ডিও লেটার অথবা ব্যবস্থাপনা-পত্র মূখ্য হিসাব কর্মকর্তা (প্রিন্সিপাল একাউন্টিং অফিসার)-কে দেওয়া হয়। যদি কোন জবাব পাওয়া না যায় অথবা জবাব সন্তোষজনক না হয় তাহলে নববই দিনের মধ্যে রিপোর্ট সম্পূর্ণ করে অনুমোদন ও নিরীক্ষা প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্তির জন্য সিঅ্যান্ডএজি-এর নিকট প্রেরণ করা হয়।
বিভিন্ন মন্ত্রণালয় বিভাগের অনুরোধে বিশেষ নিরীক্ষার ক্ষেত্রে সিঅ্যান্ডএজি-কে মাঠ নিরীক্ষকের নিকট থেকে নিরীক্ষা অনুসন্ধান রিপোর্ট পাবার পর ৬০ দিনের মধ্যে নিরীক্ষা রিপোর্ট চূড়ান্ত করতে হয়। নিরীক্ষা আপত্তিসমূহ নিরীক্ষিত পক্ষের সাথে আলোচনা, কোন কোন সময় দুই পক্ষ বা তিন পক্ষের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত করা হয়। সময় নির্দিষ্ট থাকা সত্ত্বেও বাস্তবে খুব নগণ্যসংখ্যক প্রতিষ্ঠানই এ সময়সীমা পালন করে। নিরীক্ষা বিভাগ এবং নিরীক্ষিত সংগঠনের মধ্যে চিঠিপত্র আদান-প্রদানের জন্য অনেক সময় অতিবাহিত হয়। স্বল্প অর্থ জড়িত রয়েছে এমন মামুলি আকারের নিরীক্ষা আপত্তিসমূহ অথবা নিয়মানুগের প্রয়োগ রয়েছে এমন বিষয়গুলো সাধারণ অনুচ্ছেদ হিসেবে বিবেচিত। ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে প্রয়োজনীয় কার্যক্রমের মাধ্যমে এ সংক্রান্ত বিষয় নিষ্পত্তি করা হয়।
সিঅ্যান্ডএজি-র অনুমোদনের পর গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক অনিয়মসমূহ নিরীক্ষা মন্তব্য সহকারে বার্ষিক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পরবর্তীকালে এই নিরীক্ষা প্রতিবেদন সিঅ্যান্ডএজি কর্তৃক গণপ্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপতির নিকট সংসদে প্রেরণের জন্য উপস্থাপন করা হয়। সংসদে উপস্থাপিত প্রতিবেদন পাবলিক একাউন্টস (পিএসি) কমিটি কর্তৃক আলোচিত হয়। সংসদের একটি স্থায়ী কমিটি যা পাবলিক আন্ডারটেকিং কমিটি (পিইউসি) নামে পরিচিত সে কমিটি ‘সংসদ কার্যপ্রণালী বিধি’র বিধি ২৩৮ মোতাবেক সরকারি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা ও কার্যকরিতা সংশ্লিষ্ট নিরীক্ষা প্রতিবেদন পরীক্ষা করে দেখেন।
নিরীক্ষা (অডিটিং) আর্থিক কাজকর্ম ও ঘটনাবলী সম্পর্কে নিয়মানুগ পন্থায় নিরপেক্ষ মূল্যায়ন- যার লক্ষ্য হচ্ছে বিদ্....