18/11/2011
কলমানি মার্কেটেও টাকার হাহাকার : সঙ্কট কাটাতে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বড় বড় ডিপোজিট তুলে ফেলছে
সৈয়দ মিজানুর রহমান
বিভিন্ন ব্যাংক থেকে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় বড় ডিপোজিট উত্তোলনের হিড়িক পড়ে গেছে। আর্থিক সঙ্কট প্রকট আকার ধারণ করায় সরকার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে বলে দিয়েছে ব্যাংকে রাখা তাদের গচ্ছিত অর্থ তুলে নিতে। ফলে ব্যাংকগুলোর আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের চাপ পড়ছে। এতে সরকারি-বেসরকারি ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলো সাম্প্রতিক সময়ে কলমানি মার্কেটে অর্থ জোগান বন্ধ করে দিয়েছে। সেই সঙ্গে মঞ্জুর করা ঋণের অর্থ ছাড় নিয়েও দেখা দিচ্ছে সমস্যা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত এক সপ্তাহেই সরকারি বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন ব্যাংকে রাখা প্রায় হাজার কোটি টাকার সঞ্চয় তুলে নিয়েছে। নির্ধারিত সময়ের আগেই সঞ্চয় তুলে নেয়ার ফলে বেকায়দায় পড়ছে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান।
বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক কয়েক মাস আগেও ‘কলমানি মার্কেটে’ গড়ে দৈনিক ৫০০ কোটি টাকা অর্থের জোগান দিত। এখন তা ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। পূবালী ব্যাংক আগে যেখানে কলমানি বাজারে প্রতিদিন হাজার কোটি টাকা খাটাচ্ছিল, এখন গড়ে ২শ’ কোটি টাকার বেশি দিতে পারছে না। তবে কলমানি বাজারে চাহিদা বেড়েছে আগের তুলনায় বেশি। কয়েক মাস আগে যেখানে গড়ে কলমানি সুদের হার ৬-৭ শতাংশ ছিল, এখন তা বেড়ে হয়েছে ২৩ শতাংশ পর্যন্ত।
আগে কলমানি মার্কেটে গড়ে প্রায় ৫শ’ কোটি টাকা জোগান দেয়া হতো। এখন তা মাত্র ২০-২৫ কোটি টাকায় নামিয়ে আনার কারণ জানতে চাইলে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের চেয়ারম্যান এ কিউ সিদ্দিকী আমার দেশকে বলেন, ‘আমরাই এখন সঙ্কটের মধ্যে পড়েছি। নিজেরা চলতে পারছি না।’ তিনি জানান, কলমানি মার্কেটে টাকা বিনিয়োগ করলে লাভ বেশি হয় এবং ঝুঁকিও তেমন থাকে না। কারণ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোই স্বল্পমেয়াদে এখান থেকে টাকা ধার করে। বিনিময়ে পাওয়া যায় বেশি হারে সুদ। তবে মুনাফা বেশি হলেও তাদের ব্যাংকের এখন এই খাতে বিনিয়োগ বন্ধ হওয়ার পথে। তিনি জানান, সরকারি ও আধাসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বরাবরই মোটা অঙ্কের অর্থ সঞ্চয় হিসেবে ব্যাংকে গচ্ছিত রাখে। কিন্তু গত কয়েক সপ্তাহে এসব বড় সঞ্চয় উত্তোলনের হিড়িক পড়েছে। তার নিজের ব্যাংক থেকেই দৈনিক ৫০-৬০ কোটি টাকা চলে যাচ্ছে। ফিক্সড ডিপোজিটগুলো সাধারণত তিন বছর থেকে ৫ বছর বা ১০ বছর মেয়াদি হয়। তিনি জানান, ইদানীং বড় অঙ্কের ডিপোজিট তুলে নিচ্ছে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো। এটা ব্যাংকগুলোর চলমান তারল্য সঙ্কট আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে আর্থিক খাতের সঙ্কট মোকাবিলায় তাদের নিজস্ব অর্থ ব্যাংক থেকে তুলে নিয়ে খরচ করতে বলা হয়েছে। এ কারণে সরকারি ও আধাসরকারি প্রতিষ্ঠান ব্যাংকে গচ্ছিত অর্থ তুলে নিচ্ছে।
এদিকে কলমানি মার্কেটে টাকার চাহিদা বেড়েই চলেছে। বিশেষ করে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো নিজেরা আর্থিকভাবে এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে যে, তারা কলমানি মার্কেটের ওপরই এখন নির্ভরশীল। রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংক কয়েক মাস আগে কলমানি বাজার থেকে গড়ে দৈনিক ৪শ’ কোটি টাকা ধার করত। তখন সুদের হারও ছিল ৬ থেকে ৭ শতাংশ। এখন ধার করতে হচ্ছে দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি। আর সুদ গুনতে হচ্ছে ১৭ থেকে ২৩ শতাংশ হারে। রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী, সোনালী, রূপালী ও জনতা মিলে কলমানি মার্কেট থেকে প্রতিদিন ধার করছে গড়ে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা। কলমানি মার্কেটে নিয়মিত অর্থের জোগানদাতা একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) এ বিষয়ে জানান, ‘রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ভল্টে এখন টাকা নেই। নিত্যদিনের কাজ চালাতে এখন তারা কলমানি মার্কেটের ওপর প্রায় পুরোপুরি নির্ভরশীল।’ তিনি জানান, কলমানি মার্কেটের ওপর বাড়তি চাপ পড়ায় সুদ হার বেড়ে যাচ্ছে। এটা গোটা ব্যাংকিং খাতের জন্য একটি খারাপ লক্ষণ।