07/07/2026
শহীদুল্লাহ কায়সারের 'সংশপ্তক': এক মহাকাব্যিক উপন্যাসের মহাকাব্যিক পাঠ
'সংশপ্তক' শব্দটির উৎস মহাভারত। এর অর্থ—যে যোদ্ধারা জীবন-মরণ পণ করে যুদ্ধ করে এবং কোনো অবস্থাতেই যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পিছু হটে না। এই শব্দের মধ্যেই নিহিত রয়েছে অদম্য সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও অটল প্রতিজ্ঞার চেতনা। সেই অর্থেই শহীদুল্লাহ কায়সারের 'সংশপ্তক' (১৯৬৫) বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য মহাকাব্যিক উপন্যাস, যেখানে ব্যক্তি, সমাজ ও ইতিহাস এক মহাপ্রবাহে মিলিত হয়েছে।
উপন্যাসটি শুধু একটি পরিবারের বা কয়েকজন মানুষের গল্প নয়; এটি একটি যুগের দলিল। এখানে যুগচেতনা, জীবনচেতনা ও শিল্পচেতনার অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে। প্রতিটি চরিত্রই যেমন নিজস্ব ব্যক্তিসত্তায় উজ্জ্বল, তেমনি তারা তাদের শ্রেণিসত্তারও প্রতিনিধিত্ব করে।
এই উপন্যাসে সমাজের প্রায় সব স্তরের মানুষের উপস্থিতি রয়েছে—নির্যাতিত কৃষক, প্রান্তিক নারী, শিক্ষিত মুসলিম মধ্যবিত্ত, রাজনৈতিক কর্মী, সমাজসেবী, বিবাগী দরবেশ, গ্রামীণ শঠ ও গুন্ডা—সবাই মিলে নির্মাণ করেছে এক বিস্তৃত জীবনচিত্র। উল্লেখযোগ্য চরিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে রাবেয়া খাতুন (রাবু), জাহেদ, সেকেন্দার মাস্টার, মালু (আবদুল মালেক), হুরমতী, লেকু মিয়া, রমজান প্রমুখ।
উপন্যাসের পটভূমি
উপন্যাসের মূল পটভূমি বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের কাল্পনিক গ্রাম বাকুলিয়া এবং পাশের হিন্দুপ্রধান গ্রাম তালতলি। এই গ্রামদ্বয়কে কেন্দ্র করে কাহিনি ধীরে ধীরে ঢাকা ও কলকাতার বিস্তৃত নগরজীবনে প্রবেশ করে।
উপন্যাসের অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র আবদুল মালেক, ডাকনাম মালু। তার চোখ দিয়েই পাঠক বৃহত্তর সমাজ, ইতিহাস ও জীবনের রূপ প্রত্যক্ষ করে। তবে এটি কেবল মালুর গল্প নয়; এটি রাবু, জাহেদ, হুরমতী, সেকেন্দার মাস্টার, রমজান, লেকু মিয়াসহ অসংখ্য মানুষের জীবনসংগ্রামের কাহিনি।
সময়টি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্ববর্তী বাংলা। তখন হিন্দু-মুসলমানের সহাবস্থান ছিল তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ। কৃষক, বর্গাচাষি ও শ্রমজীবী মানুষের জীবনসংগ্রাম, গ্রামীণ দ্বন্দ্ব, জমিজমা নিয়ে বিরোধ, সামাজিক বৈষম্য—সবকিছুই জীবন্ত হয়ে উঠেছে উপন্যাসে।
মিয়া বাড়ি ও সৈয়দ বাড়ির দীর্ঘদিনের বিরোধ, ফেলু মিয়ার হারানো জমি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা, রমজানের কূটচাল, প্রান্তিক মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই—সবকিছু মিলিয়ে বাকুলিয়ার জীবনচিত্র ক্রমেই জটিল হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে সৈয়দ বাড়ির মুনশির ছেলে মালু, রাবু ও আরিফার স্নেহে বড় হতে থাকে। জাহেদের আদর্শবাদী মনোভাব তার জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ১৯৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এবং ১৯৪৭ সালের দেশভাগ একসময়ের শান্ত বাকুলিয়াকে বিপর্যস্ত করে তোলে।
যাযাবরের মতো ঘুরে বেড়ানো মালুর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে পাঠক প্রত্যক্ষ করে একটি ভাঙতে থাকা সমাজ, বদলে যাওয়া ইতিহাস এবং নতুন ভবিষ্যতের স্বপ্ন। ধ্বংসের মাঝেও রাবেয়া, জাহেদ, সেকেন্দার মাস্টার ও মালুরা আশা হারায় না; তারা নতুন সমাজ ও নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখে। এখানেই 'সংশপ্তক'-এর মহাকাব্যিক শক্তি।
'সংশপ্তক' নাটক
শহীদুল্লাহ কায়সারের এই কালজয়ী উপন্যাস অবলম্বনে বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি)-তে নির্মিত হয় জনপ্রিয় ধারাবাহিক নাটক 'সংশপ্তক'। নাটকটির চিত্রনাট্য রচনা করেন ইমদাদুল হক মিলন।
ধারাবাহিকটির নির্মাণ শুরু হয় ১৯৭১ সালে। কিন্তু চারটি পর্ব প্রচারের পরই মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ায় এর নির্মাণ ও সম্প্রচার বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ বিরতির পর ১৯৮৮ সালে আবার নির্মাণকাজ শুরু হলেও ওই বছরের ভয়াবহ বন্যার কারণে পুনরায় কাজ বন্ধ হয়ে যায়। পরে বন্যা শেষে নাটকটির নির্মাণ সম্পন্ন হয়।
প্রথম দিকের পর্বগুলোর পরিচালক ছিলেন আবদুল্লাহ আল মামুন ও আল মনসুর। শেষের দিকের পর্বগুলো পরিচালনা করেন মোহাম্মদ আবু তাহের।
নাটকটির অন্যতম আকর্ষণ ছিলেন হুমায়ূন ফরীদি। তাঁর অভিনীত 'কানকাটা রমজান' চরিত্রটি এতটাই জনপ্রিয় হয় যে এই নামেই তিনি দর্শকদের কাছে দীর্ঘদিন পরিচিত ছিলেন। এছাড়া ফেরদৌসী মজুমদার, সুবর্ণা মুস্তাফা, রাইসুল ইসলাম আসাদ, মুজিবুর রহমান দিলু, মামুনুর রশীদসহ অসংখ্য গুণী শিল্পীর অভিনয় নাটকটিকে বাংলা টেলিভিশনের ইতিহাসে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
'সংশপ্তক' বাংলার গ্রামীণ সমাজ, রাজনৈতিক পরিবর্তন, সাম্প্রদায়িক বিভাজন, শ্রেণিসংগ্রাম এবং মানুষের অবিনাশী স্বপ্নের এক মহাকাব্যিক দলিল। সময়ের পরিবর্তন সত্ত্বেও এই উপন্যাস আজও সমান প্রাসঙ্গিক এবং বাংলাদেশের ১৯৪৭ পরবর্তী সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হিসেবে বিবেচিত।