30/10/2025
বক্তব্য
বিষয়ঃ “বীমা শিল্পে তরুণদের কর্মসংস্থান এবং একচ্যুয়ারি পেশার বিকাশ ও সম্ভাবনা”
আসসালামু আলাইকুম।
সম্মানিত সভাপতি,
বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের মাননীয় চেয়ারম্যান ড. এম. আসলাম আলম,
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপক জনাব ফজলুল হক, সদস্য (প্রশাসন), IDRA,
মুখ্য আলোচক ড. মোহাম্মদ সোহরাব উদ্দীন, একচ্যুয়ারি,
সহ আলোচক জনাব বি. এম. ইউসুফ আলী, মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা, পপুলার লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড ও প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরাম,
সহ আলোচক মিস আফরিন হক, একচ্যুয়ারি,
এবং উপস্থিত আমার প্রিয় সহযোদ্ধা -লাইফ ও নন-লাইফ বীমা কোম্পানির সম্মানিত মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তাবৃন্দ,
জীবন ও সাধারণ বীমা কর্পোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালকবৃন্দ,
বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের মাননীয় সদস্য ও নির্বাহী পরিচালকবৃন্দ,
এবং প্রিয় অংশগ্রহণকারী সকলকে জানাই আমার আন্তরিক সালাম ও শুভেচ্ছা।
আজকের কর্মশালার বিষয়টি অত্যন্ত সময়োপযোগী|
“বীমা শিল্পে তরুণদের কর্মসংস্থান ও একচ্যুয়ারি পেশার বিকাশ এবং সম্ভাবনা।”
এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কথা বলার সুযোগ দেয়ার জন্য আমি আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানাই IDRA–Bangladesh -কে।
প্রিয় সুধী,
আমি ইমাম শাহীন।
৩৬ বছর আগে, ১৯৮৯ সালে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জনের পর Stopgap job ভেবে আমি
Green Delta Insurance এ যোগ দিই। বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের চূড়ান্ত ধাপ থেকে বাদ পড়ে বীমা পেশায় আসা- হয়তো তখন ভাগ্যের এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছিল আমার জীবনে। ধীরে ধীরে এই পেশাকেই আমি নিজের জীবনের serious commitment হিসেবে গ্রহণ করি।
তবে আজও আমার মনে হয়- আমাদের দেশে, এমনকি শিক্ষিত সমাজেও, বীমা পেশার প্রতি একটি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বিরাজমান। সাধারণ মানুষের এই মানসিকতা পরিবর্তনে আমরা এখনো পুরোপুরি সফল হইনি। বরং নানা কারণে এই পেশা ও পেশাজীবীদের প্রতি একধরনের ভুল ধারণা ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতির পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে-
প্রথমত, আমরা কখনোই পর্যাপ্ত সংখ্যক মেধাবী ও যোগ্য তরুণ এই পেশায় আকৃষ্ট করতে পারিনি। যারা এসেছে, তারা অনেকেই বীমাকে সাময়িক চাকরি ভেবে এসেছেন- আর সামাজিক ও আর্থিক কারণে বেশিরভাগই অন্য খাতে চলে গেছেন।
কিন্তু যারা থেকে গেছেন, যারা এই পেশাকে নিজের মনে করে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে গেছেন- তারা আজ কারো চেয়ে পিছিয়ে নেই। বরং অনেকের career growth অন্য যে কোনো পেশার চেয়েও উজ্জ্বল।
অর্থাৎ, input ভালো হলে output ভালো হবেই- বীমা খাতেও এর ব্যতিক্রম নয়।
দ্বিতীয়ত, দাবি নিষ্পত্তি বিলম্বিত হওয়া কিংবা কিছু অসাধু উদ্যোক্তার কারণে পুরো সেক্টরটি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এর ফলে সমাজে আমাদের মর্যাদা ক্ষুন্ন হচ্ছে, বিশেষ করে লাইফ বীমা কোম্পানির মাঠপর্যায়ের কর্মীরা আজ কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি।
প্রিয় উপস্থিতি,
এখন সময় এসেছে- আমরা সবাই মিলে বীমা পেশায় মেধাবী তরুণদের আকৃষ্ট করতে সচেষ্ট হই। তাদের যত্নে বড় করি, উৎসাহ দিই, এবং এই শিল্পে ধরে রাখি।
না হলে আগামী ১০-১৫ বছরে আমরা প্রতিস্থাপনযোগ্য জনবল সংকটে পড়ব- যা শিল্পের অগ্রগতিকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করবে।
একটি প্রতিষ্ঠানের টিকে থাকা অনেকাংশে নির্ভর করে উদ্যোক্তাদের দূরদর্শিতা ও সততার উপর। ইতিহাস বলছে- যেসব উদ্যোক্তা সৎ উদ্দেশ্যে, দীর্ঘমেয়াদে প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন, তাদের কোম্পানিগুলো আজও টিকে আছে, সফলভাবে চলছে। আর যারা শুধুই দ্রুত মুনাফা বা অপব্যবহারের চিন্তা করেছেন- তারা ইতোমধ্যে ইতিহাসের পৃষ্ঠায় হারিয়ে গেছেন।
রাজনৈতিক বিবেচনায় বিভিন্ন সরকারের সময় বহু আর্থিক প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে- কিন্তু উদ্যোক্তাদের যোগ্যতা ও সততা যাচাই করা গেলে, আজ হয়তো চিত্রটা আরও সুন্দর হতো।
আমরা সবাই জানি, আমাদের কর্মজীবন একদিন শেষ হবে। কিন্তু যদি আমরা এখন থেকেই দীর্ঘমেয়াদে দক্ষ জনবল তৈরি না করি, তবে পরবর্তী প্রজন্ম আমাদের পদ-পদবী নিয়ে গর্ব করতে পারবে না।
আমি চাই, আমার নাতি-নাতনি গর্ব করে বলতে পারে- “আমার দাদা এশিয়া ইন্স্যুরেন্সের এমডি ছিলেন।”
তবুও, সব চ্যালেঞ্জ সত্তেও, আমরা গর্ব করতে পারি|
এই বীমা পেশাই আমাদের দিয়েছে সৎ ও স্বচ্ছল জীবনযাপন।
আমরা সরকারকে রাজস্ব দিচ্ছি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছি, দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছি- যা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।
সম্মানিত উপস্থিতিবৃন্দ,
বীমা শিল্প একটি দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার ভিত্তি।
এটি শুধু ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নয়- এটি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও প্রগতির চাবিকাঠি।
তরুণ প্রজন্ম এই খাতে যুক্ত হলে আমাদের সমাজে এক নতুন দিগন্তের সূচনা হবে।
তারা নিয়ে আসবে নতুন ধারণা, প্রযুক্তি সচেতনতা এবং উদ্ভাবনী শক্তি।
আর যখন এই শক্তি একচ্যুয়ারি পেশার সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন তৈরি হয় ডেটা বিশ্লেষণ, ঝুঁকি মূল্যায়ন ও অর্থনৈতিক পূর্বাভাসের এক নতুন দিগন্ত।
আজকের বিশ্বে একচ্যুয়ারি পেশা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুরসহ উন্নত দেশগুলোতে একচ্যুয়ারিরা বীমা শিল্পে ডিজিটাল রূপান্তরের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
একচ্যুয়ারি কেবল প্রিমিয়াম হিসাব করেন না- তারা কৌশল তৈরি করেন, ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তে অবদান রাখেন।
তরুণরা যদি এই পেশায় আসে, তারা শুধু উচ্চ বেতন নয়- একটি মর্যাদাপূর্ণ ও উদ্ভাবনী ক্যারিয়ার পথ খুঁজে পাবে।
এখানে আমি একটি শব্দের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে চাই|
“উদ্ভাবনী মনোভাব।”
যত বেশি তরুণ নতুন ধারণা নিয়ে আসবে, ততই আমাদের বীমা শিল্প হবে আধুনিক, স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক।
বিশ্বের যেখানে তরুণরা বীমা শিল্পে সক্রিয়, সেখানে শিল্প দ্রুত বিকশিত হচ্ছে- প্রযুক্তি-নির্ভর হয়ে উঠছে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও গ্রাহক সেবা।
প্রিয় সুধীমন্ডলী,
আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি- যদি তরুণরা একচ্যুয়ারি পেশার সম্ভাবনাকে গ্রহণ করে, তাহলে বীমা শিল্প কেবল একটি চাকরির ক্ষেত্র নয়, বরং এটি হবে অর্থনৈতিক প্রগতি, দক্ষতা বিকাশ ও সামাজিক স্থিতিশীলতার সোপান।
এ বিষয়ে আমাদের দেশে বরেণ্য একচ্যুয়ারি ড. মোহাম্মদ সোহরাব উদ্দীন স্যার উপস্থিত আছেন- তাই আমি আর বিস্তারিত আলোচনায় না গিয়ে শুধু বলতে চাই:
তরুণরা আমাদের ভবিষ্যৎ।
তারা যদি সাহসী হয়, জ্ঞান অর্জনে আগ্রহী হয়, উদ্ভাবনী চিন্তা নিয়ে এগিয়ে আসে|
তাহলে একচ্যুয়ারি পেশা হয়ে উঠবে তাদের সৃজনশীলতা, প্রতিভা ও নেতৃত্বের মঞ্চ।
চলুন আমরা সবাই মিলে এই তরুণ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করি, সহযোগিতা করি, পথ দেখাই।
আমরা হয়তো অবসরে যাবো, কিন্তু চাই আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম গর্ব করে বলতে পারুক|
“আমার বাবা, আমার দাদা ছিলেন এক বীমা যোদ্ধা।”
সবশেষে,
আপনাদের সকলকে ধৈর্য ধরে আমার কথা শোনার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ।
সবাই সুস্থ থাকুন, নিরাপদ থাকুন।
মহান সৃষ্টিকর্তা আমাদের সকলের সহায় হোন।
আল্লাহ হাফেজ।