Citytouch

Directions Website Contact the business

Citytouch Digital Banking Service from City Bank brings you the simplest way to handle banking.

নোবেল সাহিত্য পুরস্কার ২০২৬: সাহিত্যকে অ্যান কার্সন যেভাবে দেখেন গত ৮ অক্টোবর সুইডিশ অ্যাকাডেমি ২০২৬ সালের সাহিত্যে নোবে...
11/10/2026

নোবেল সাহিত্য পুরস্কার ২০২৬: সাহিত্যকে অ্যান কার্সন যেভাবে দেখেন

গত ৮ অক্টোবর সুইডিশ অ্যাকাডেমি ২০২৬ সালের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের নাম ঘোষণা করে—অ্যান কার্সন। কানাডার এই কবি-প্রাবন্ধিক বছরের পর বছর সম্ভাব্য তালিকায় ছিলেন, তবু অনেক পাঠকের কাছে নামটা একটু অচেনা। কারণ তার লেখা সহজ কোনো ছকে ফেলা যায় না। কবিতা, প্রবন্ধ, অনুবাদ, নাটকের সংলাপ সব একসঙ্গে মিশে যায় এক বইয়ের ভেতর।

অ্যাকাডেমি বলেছে, প্রাচীন সাহিত্যের সঙ্গে খেলাচ্ছলে কথা বলতে বলতে কার্সন সমকালীন সাহিত্যের নতুন রূপ তৈরি করেছেন।

এই "নতুন রূপ" জিনিসটা আসলে কী? সাহিত্য বলতে তিনি ঠিক কী বোঝেন? এটুকু বুঝতে হলে কার্সনের একদম শুরুর দিককার একটা ভাবনায় ফিরতে হয়।

চাওয়ার ভেতরেই একটা ফাঁক

৭৬ বছর বয়সী কার্সন জন্মসূত্রে টরন্টোর মানুষ, পেশায় সারা জীবন প্রাচীন গ্রিক সাহিত্যের শিক্ষক। এখানেই তার আসল পরিচয় লুকিয়ে। একদিকে কড়া পণ্ডিত, শব্দের শিকড় আর পুরোনো ব্যাকরণ নিয়ে যার কারবার; অন্যদিকে সেই মানুষটাই লেখেন প্রেম, বিরহ আর শোক নিয়ে। বিদ্যা আর আবেগ—এই দুইয়ের মাঝখানেই কার্সনের গোটা দুনিয়া।

তার প্রথম বই ‘Eros the Bittersweet’ (১৯৮৬) আসলে ছিল গ্রিক কবি সাফোকে নিয়ে তার গবেষণাপত্রের নতুন চেহারা। শুকনা অ্যাকাডেমিক একটা কাজ, যা শেষমেশ হয়ে দাঁড়াল আকাঙ্ক্ষার ব্যথা নিয়ে লেখা একটা বই। বইটার মূল কথা একটাই: মানুষ সেটাই চায়, যা তার কাছে নেই।

সাফো একবার ভালবাসাকে বলেছিলেন "তেতো-মিষ্টি"। কার্সন এই শব্দটা ধরেই আগান। প্রেম মানে পাওয়া নয়, প্রেম মানে হাত বাড়ানো—যা নাগালের বাইরে, তার দিকে। যে মুহূর্তে জিনিসটা হাতে এসে যায়, চাওয়াটাও বদলে যায়। তাই চাওয়ার জন্য সবসময় একটা দূরত্ব লাগে, একটা ফাঁক লাগে। সেই ফাঁকটাই প্রেমের আসল জায়গা।

এখানেই কার্সনের আসল চমক। তিনি বলেন, এই একই ফাঁক লুকিয়ে আছে ভাষার ভেতরেও। আমরা যা বলতে চাই আর যা আসলে বলি, দুটি কখনও পুরোপুরি মেলে না। পড়ার সময়ও তাই—লেখকের মনের কথা আর পাতায় ছাপা কথা, এর মাঝখানে একটা দূরত্ব থেকেই যায়।

অর্থাৎ ভালবাসা আর পড়া, দুটিরই গড়ন এক। দুটিই একটা ফাঁকের ওপর দিয়ে হাত বাড়ানো। কার্সনের কাছে সাহিত্য এই হাত বাড়ানোর কাজটাই।

খোপ ভাঙা

এই জায়গা থেকেই বোঝা যায়, কেন তিনি কবিতা-প্রবন্ধ-গল্পের দেয়াল মানেন না। সাহিত্য যদি পাকা ছকে বাঁধা কোনো জিনিস না হয়ে একটা গতি হয়, পৌঁছাতে চাওয়ার একটা চেষ্টা হয়, তাহলে খোপের বেড়া সেখানে অর্থহীন।

তার ‘Autobiography of Red’ বইটার কথা ধরা যাক। গ্রিক পুরাণে গেরিয়ন নামের এক লাল রঙের দানব ছিল, হারকিউলিসের হাতে যার মৃত্যু হয়। কার্সন সেই দানবকে তুলে আনেন আজকের দিনে। এক লাজুক, ডানাওয়ালা কিশোর হিসাবে, যে প্রেমে পড়ে, ক্যামেরা হাতে ঘুরে বেড়ায়। পুরা বইটা পদ্যে লেখা এক উপন্যাস।

আবার ‘Nox’ বইটা তার মৃত ভাইকে নিয়ে। এটা সাধারণ কোনো বই নয়—একটা বাক্সের ভেতরে ভাঁজ করা লম্বা একটা কাগজ, অনেকটা স্ক্র্যাপবুকের মত, যেখানে পুরোনো ছবি, চিঠির টুকরা আর ল্যাটিন শব্দের অনুবাদ পাশাপাশি বসানো।

এগুলিকে ঠিক কী বলা হবে: কবিতা, নাকি উপন্যাস, নাকি শোকগাথা? কার্সন এই প্রশ্নটাকেই পাত্তা দেন না। তার কাছে জরুরি প্রশ্নটা অন্য, লেখাটা পাঠককে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে।

অনুবাদ মানে পুরোনো গলা আবার শোনা

কার্সনের কাজের একটা বড় অংশ অনুবাদ। বিশেষ করে সাফো, সফোক্লিস, ইউরিপিদিস। কিন্তু অনুবাদ নিয়ে তার ভাবনাটাও আলাদা। এক ভাষা থেকে আরেক ভাষায় কথাগুলি অবিকল তুলে দেওয়া তার লক্ষ্য নয়। তিনি চান, হাজার বছর আগের একটা স্বর যেন আবার জীবন্ত হয়ে ওঠে।

সাফোর কবিতা আজ প্রায় পুরাটাই টিকে আছে টুকরা অবস্থায়। ছেঁড়া প্যাপিরাস, মুছে যাওয়া শব্দ, মাঝে মাঝে ফাঁকা। অনেক অনুবাদক সেই ফাঁক ভরাট করে দেন, যাতে পড়তে সুবিধা হয়। কার্সন উল্টা পথে হাঁটেন। তিনি ফাঁকগুলি রেখে দেন, বন্ধনী দিয়ে দেখিয়ে দেন কোথায় শব্দ হারিয়ে গেছে। কারণ তার চোখে ওই হারানো অংশটুকুই কবিতার প্রাণ। যা নেই, তার দিকে পাঠক যেন নিজেই হাত বাড়ায়—আর সেখানেই তো সাহিত্যের শুরু।

তার কাছে প্রাচীন গ্রিস জাদুঘরে সাজানো মসৃণ কোনো মূর্তি নয়। সেটা ভাঙা, অসম্পূর্ণ, শরীরী, আকাঙ্ক্ষায় ভরা এক জগৎ—যার প্রশ্নগুলি আজও আমাদের প্রশ্ন।

এই নোবেল আসলে কী বলছে

নোবেল পুরস্কার সাধারণত যায় মোটা উপন্যাস বা জাতির মহাকাব্য লেখা মানুষদের কাছে। সেই জায়গায় কার্সনের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া একটা স্পষ্ট বার্তা। সাহিত্য ছোট হতে পারে, টুকরা হতে পারে, অদ্ভুত হতে পারে—তবু চাওয়া, হারানো আর হাত বাড়ানোর একদম কেন্দ্রে গিয়ে পৌঁছাতে পারে।

কার্সনের লেখা অনেকের কাছে কঠিন ঠেকে, এটা সত্যি। কিন্তু সেই কঠিনত্ব ভড়ং নয়। ভাষা আর আকাঙ্ক্ষা জিনিসটা আসলে যতটা এলোমেলো, যতটা অসম্পূর্ণ, তিনি ঠিক ততটাই সৎভাবে লেখেন। সহজ করে মিথ্যে বলার চেয়ে কঠিন করে সত্যি বলা—কার্সন বরাবর দ্বিতীয়টাই বেছে নিয়েছেন। নোবেল কমিটিও এবার সেটাকে স্বীকৃতি দিল।

তাহলে মানুষটা কেমন?

এতক্ষণের কথা কার্সনের লেখা আর ভাবনা নিয়ে—সবটাই বাইরে থেকে দেখা। কিন্তু মানুষটা নিজের মুখে বললে একই ভাবনাগুলি অন্যভাবে প্রকাশ পায়, অনেকটাই হালকা চালে।

লেখার শুরু নিয়ে তার একটাই পরামর্শ আছে—"মাঝখান থেকে শুরু করুন।" সাজানো শুরু-মধ্য-শেষের ছক তিনি মানেন না; যে জায়গাটা তাকে বেশি টানে, লেখা শুরু হয় সেখান থেকেই।

নিজের লেখার ধরনকে বলেন "অনিচ্ছাকৃত", কারণ আসলে অন্য কিছু করতে গিয়েই লেখা হয়ে যায়। আর প্রাচীন গল্প আজ প্রাসঙ্গিক কি না জিজ্ঞেস করলে প্রশ্নটাই উল্টে দেন—ওরা আমাদের কাছে প্রাসঙ্গিক কি না, সেটা বড় কথা নয়; বড় কথা, আমরা ওদের কাছে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে পারি কি না।

প্রবন্ধে যে ভাবনাগুলি গুছিয়ে বলা, নিচের সাক্ষাৎকারে সেগুলিই ছড়িয়ে আছে আটপৌরে ঢঙে। দুটি একসঙ্গে পড়লে কার্সনকে আরও সম্পূর্ণ করে চেনা যায়।

অ্যান কার্সন: তার ভাষায়

নোবেল ঘোষণার পরপরই কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে জেনি রিডেন টেলিফোনে কথা বলেন কার্সনের সঙ্গে। আলাপে কার্সন ঠিক যেমন, তার লেখাও অনেকটা তেমন—নির্লিপ্ত, কৌতুকপ্রবণ, আর চট করে ধরা না-দেওয়া। জীবনের সবচেয়ে বড় সাহিত্য-পুরস্কারের খবরটাকে তিনি নামিয়ে আনেন বিস্কুট-চা আর মেঝে ঝাড়ু দেওয়ার স্তরে, প্রশ্নকর্তাকে উল্টো প্রশ্ন ছুড়ে দেন, আর লেখালেখি নিয়ে গোটা পরামর্শ সেরে ফেলেন একটা বাক্যে। ছোট্ট এই কথোপকথনেই তার মেজাজটা পুরোপুরি ধরা পড়ে।

জেনি রিডেন: হ্যালো, আমি নোবেল পুরস্কার কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে জেনি রিডেন বলছি।

অ্যান কার্সন: ওহ, ভালো। ঠিক আছে, লাইনে পেয়ে গেছি। বলুন।

জেনি রিডেন: ঠিক আছে, আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। প্রথমেই আপনাকে অনেক অভিনন্দন!

অ্যান কার্সন: ধন্যবাদ। ব্যাপারটা বেশ পাগলাটে।

জেনি রিডেন: এই মুহূর্তে আপনার কেমন লাগছে? আর খবরটা কীভাবে পেলেন? ঘটনাটা একটু আমাদের বর্ণনা করবেন?

অ্যান কার্সন: আমি এখন বিস্কুট খাচ্ছি আর এক কাপ চা পান করছি। এখনো তেমন নাটকীয় কিছু ঘটেনি। এখনো সকাল। তাই রান্নাঘরে বসে চা পান করছি আর লন্ডন রিভিউ অব বুকস পড়ছি। খেয়াল করলাম, মেঝেটা ঝাড়ু দেওয়া দরকার। তাই লাফ দিয়ে উঠে সেটা করতে গেলাম। তারপর একের পর এক ফোন আসতে শুরু করল। আমি ফোনগুলো বারবার বন্ধ করে দিচ্ছিলাম, কারণ ফোন বাজলেই আমি সাধারণত সেটি বন্ধ করে দিই।

রবার্ট কারি: আমি ওর স্বামী। আপনারা আমার কাছে ঋণী, কারণ আমিই ওকে আপনাদের নম্বরে আবার ফোন করতে বাধ্য করেছি।

অ্যান কার্সন: হ্যাঁ, ও-ই ফোন ধরে। আমি সাধারণত ফোন বন্ধ করে দিই। ও ফোন ধরে, তারপর আমাকে আবার ফোন করতে বলে। ব্যাপারটা একটু পাগলামির মতো মনে হচ্ছে। আমার মনে হয়, আপনারা সবাই পাগল হয়ে গেছেন।

জেনি রিডেন: ব্যাপারটাকে আপনার কাছে পাগলাটে আর পাগলামির মতো মনে হচ্ছে কেন? আপনি কি এটা আশা করেননি?

অ্যান কার্সন: আরে, ঈশ্বরের দোহাই, কে-ই বা এমন কিছু আশা করবে?

জেনি রিডেন: আপনি বললেন, আপনি বাড়িতে ছিলেন। বাড়িটা কোথায়?

অ্যান কার্সন: রেইকিয়াভিকে, সমুদ্রের ধারে। সেখান থেকে উত্তর মেরু অঞ্চলের দিকে তাকানো যায়। দুঃখিত, আপনাদের জন্য আমি ঘটনাটাকে খুব নাটকীয় করে তুলতে পারছি না। এখানে দিনটা আর দশটা সাধারণ দিনের মতোই কাটছে।

জেনি রিডেন: এই নোবেল পুরস্কার আপনার কাছে কী অর্থ বহন করে, তা নিয়ে কি কিছু ভেবেছেন?

অ্যান কার্সন: না, ভাবিনি। আমরা শুধু কীভাবে পুরস্কারের টাকাটা অন্যদের দিয়ে দেওয়া যায়, সেই উপায় খুঁজছি। আমাদের এক বন্ধু আছে, তার একটা বাড়ি দরকার। আর আমরা ডক্টরস উইদাউট বর্ডার্স সংস্থাকে সব সময়ই বেশ কিছু অর্থ দান করি। হ্যাঁ, এ রকমই কিছু কাজে টাকা দেব।

জেনি রিডেন: এই অপ্রত্যাশিত খবর কীভাবে উদযাপন করবেন?

অ্যান কার্সন: সত্যি বলতে, আমরা বনে হাঁটতে বের হব, যাতে ফোনের উত্তর দিতে না হয়। তারপর আমরা নীরবতা শুনব।

জেনি রিডেন: চমৎকার। এবার লেখক হিসেবে আপনি এবং আপনার কাজ সম্পর্কে কথা বলি। যারা আপনাকে খুব ভালোভাবে চেনেন না, তাদের কাছে নিজের লেখালেখির ধরন কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

অ্যান কার্সন: আমি বলব, এটা অনিচ্ছাকৃত। আমি সব সময় অন্য কিছু করার চেষ্টা করি।

জেনি রিডেন: যারা আপনাকে খুব ভালোভাবে চেনেন না, কিন্তু আপনার বই ও কাজ সম্পর্কে আরও জানতে চান, তাদের কোথা থেকে শুরু করার পরামর্শ দেবেন?

অ্যান কার্সন: জানি না। যেকোনো জায়গা থেকেই শুরু করা যায়। বেশির ভাগ মানুষ অটোবায়োগ্রাফি অব রেড পড়েন। আমি নিজেও সেটা পড়েছি। আমার মনে হয়েছে, বইটা সহজে পড়া যায়। তবে আমি জানি না। আমি সব সময় বলি, মাঝখান থেকে শুরু করুন।

জেনি রিডেন: শুরু করার প্রসঙ্গ যখন এলই, তখন জানতে চাই — আপনি যখন নতুন কোনো বইয়ের কাজ শুরু করেন, তখন কীভাবে শুরু করেন? আপনার লেখার প্রক্রিয়াটা কেমন?

অ্যান কার্সন: মাঝখান থেকে শুরু করুন। এটাই আমার একমাত্র নিয়ম।

জেনি রিডেন: সেটা আবার কী রকম?

অ্যান কার্সন: কথাটার যে অর্থই আপনি করুন না কেন, মাঝখানটা খুঁজে বের করুন, সেখান থেকেই শুরু করুন।

জেনি রিডেন: অনুপ্রেরণার জন্য কি নির্দিষ্ট কোনো উৎসের কাছে ফিরে যান?

অ্যান কার্সন: হোমার।

জেনি রিডেন: আপনি ধ্রুপদি সাহিত্য পড়ান। প্রাচীন সাহিত্যের অনেক গল্পকে আধুনিক প্রেক্ষাপটে ব্যবহার করেছেন। আপনার মনে হয়, আজকের মানুষের কাছে এসব গল্প প্রাসঙ্গিক কেন?

অ্যান কার্সন: এগুলো প্রাসঙ্গিক নয়। প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে আমি আগ্রহী বলে মনে হয় না। বরং আমি আগ্রহী, আমরা যেন তাদের কাছে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠি।

জেনি রিডেন: আমি পড়েছি, আপনি বলেছেন, আপনার কাছে একঘেয়েমি এড়িয়ে চলা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এমনটা কেন?

অ্যান কার্সন: আচ্ছা, কেউই তো একঘেয়ে বোধ করতে পছন্দ করেন না, তাই না? আপনি কি একঘেয়েমি এড়িয়ে চলেন না?

জেনি রিডেন: আপনার কাছে ব্যাপারটা এত গুরুত্বপূর্ণ কেন বলে মনে হয়?

অ্যান কার্সন: ব্যাপারটা অতটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। দিনের পরের কাজটা কী করব, তা ঠিক করার একটা মাপকাঠি মাত্র। যেমন, মেঝেতে ঝাড়ু দেব, নাকি হোমার পড়ব। দিনের অনেকটা সময়ই একঘেয়েমি এড়িয়ে চলার ব্যাপার। জীবন একঘেয়ে।

জেনি রিডেন: আপনার সত্যিই তা-ই মনে হয়?

অ্যান কার্সন: এর মধ্যে কিছু একটা করুন।

জেনি রিডেন: বেশ ভালো পরামর্শ। আর যারা লেখক হতে চান, তাদের জন্য আপনার কোনো বার্তা আছে?

অ্যান কার্সন: না, সেই একই কথা। মাঝখান থেকে শুরু করুন।

জেনি রিডেন: পেছনে আপনার ফোনগুলো বাজতে শুনতে পাচ্ছি। আমাদের সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ। আবারও অভিনন্দন।

অ্যান কার্সন: আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ।

#নোবেল #সাহিত্য #অ্যানকার্সন

নোবেল ২০২৬: রসায়নঅণুর ডান-বাম সমস্যার যে সমাধান বদলে দিয়েছে রসায়নের দুনিয়াআপনার দুটি হাতের দিকে একবার তাকান। ডান হাত...
09/10/2026

নোবেল ২০২৬: রসায়ন
অণুর ডান-বাম সমস্যার যে সমাধান বদলে দিয়েছে রসায়নের দুনিয়া

আপনার দুটি হাতের দিকে একবার তাকান। ডান হাত আর বাম হাত দেখতে প্রায় এক রকম, অথচ একটা অন্যটার ওপর রাখলে পুরাপুরি মেলে না। একটা যেন অন্যটার আয়নায় দেখা ছবি। ডান হাতের দস্তানা বাম হাতে পরতে গেলে যেমন বেমানান লাগে, ঠিক তেমন।

অবাক করা ব্যাপার হল, প্রকৃতির অনেক ছোট ছোট অণুরও এমন ডান-বাম দুটি রূপ থাকে। বিজ্ঞানে একে বলে কাইরালিটি (chirality)। আপনার শরীর, আপনি যে ওষুধ খান, এমনকি ফুলের গন্ধ, সবকিছুর পেছনেই এই ডান-বামের খেলা লুকিয়ে আছে।

এই দুটি রূপের কথা প্রথম জানা গেল কবে

সময়টা ১৮৪৮ সাল। ফরাসি বিজ্ঞানী লুই পাস্তুর তখন সবে ২৫ বছরের তরুণ। প্যারিসের একোল নরমাল সুপেরিয়রের পরীক্ষাগারে তিনি আঙুরের রস থেকে পাওয়া এক ধরনের লবণের ছোট ছোট দানা অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে রেখে খুঁটিয়ে দেখছিলেন। হঠাৎ তাঁর চোখে পড়ল, দানাগুলি আসলে দুই রকম। একদল একদিকে হেলানো, আরেকদল ঠিক উল্টো দিকে। যেন একই জিনিসের ডান আর বাম রূপ।

পাস্তুর তখন যা করলেন, সেটা ভাবলে আজও অবাক লাগে। সরু চিমটে দিয়ে একটা একটা করে দানা বেছে তিনি দুই রূপকে আলাদা দুই স্তূপে ভাগ করে ফেললেন, শুধু হাতে আর ধৈর্যে। এভাবেই মানুষ প্রথম চোখে দেখল, অণুরও আয়না-যমজ থাকতে পারে।

আসল সমস্যাটা কোথায়

ল্যাবরেটরিতে বিজ্ঞানীরা যখন কোনো অণু বানান, তখন সাধারণত ডানহাতি আর বামহাতি রূপ দুটিই সমান পরিমাণে তৈরি হয়ে যায়। অথচ শরীরের ভেতরে প্রায়ই কাজ করে মাত্র একটা রূপ। কারণটা সেই হাত আর দস্তানার মতই। আমাদের শরীরের ভেতরের অংশগুলিও এক হাতের, তাই সঠিক হাতের অণুটাই কেবল খাপে খাপে বসে। উল্টা হাতের রূপটা সেই খাপে ঠিকমত বসে না। সেটা তখন হয়ত একেবারেই অকেজো থাকে, নয়ত কম কাজের হয়, আবার কখনও উল্টা ক্ষতিও করে বসে।

শরীরে এই ডান-বামের ফারাক যে সত্যিই আলাদা কাজ করে, বিজ্ঞানীরা তা টের পেয়েছিলেন অনেক আগেই, আজ থেকে প্রায় ১৩০ বছর আগে। স্কটিশ ওষুধ-বিজ্ঞানী আর্থার কুশনির মত কেউ কেউ তখনই দেখিয়েছিলেন, একই ওষুধের দুই আয়না-রূপ শরীরে আলাদা আচরণ করে। কিন্তু গোটা দুনিয়া বিষয়টাকে সত্যিকার গুরুত্ব দিতে বাধ্য হয় একটা মর্মান্তিক ঘটনার পর।

থ্যালিডোমাইড নামের একটা ওষুধ ১৯৫০-এর দশকের শেষ দিকে গর্ভবতী মায়েদের দেওয়া হত বমিভাব কমাতে। এর একটা রূপ কাজের ছিল, কিন্তু উল্টা রূপটা ভয়ঙ্কর ক্ষতিকর। ফলে অনেক শিশু জন্মেছিল হাত-পায়ের গুরুতর সমস্যা নিয়ে। বিপদটা ধরা পড়তেই ১৯৬১-৬২ সালের দিকে ওষুধটা বাজার থেকে তুলে নেওয়া হয়। এই ঘটনাই গোটা দুনিয়াকে নাড়িয়ে দিয়ে বুঝিয়ে দিল, একটা অণুর ডান আর বাম রূপ কতটা আলাদা আচরণ করতে পারে।

আরও একটা কথা আছে। শুধু ভাল রূপটি বেছে দিলেও বিপদ পুরোপুরি এড়ানো যেত না। কারণ, শরীরের ভেতরে থ্যালিডোমাইডের একটি রূপ নিজে থেকেই অন্য রূপে বদলে যেতে পারে। এই পরিবর্তনকে কাইরাল ইনভার্সন (chiral inversion) বলা হয়। আর কোনো পদার্থের ডান ও বাম—দুই রূপ পরস্পরের মধ্যে বদলাতে বদলাতে দুই রূপের মিশ্রণ তৈরি হওয়ার প্রক্রিয়াকে বলে রেসিমাইজেশন (racemization)। ফলে ওষুধ তৈরির সময় শুধু একটি রূপ আলাদা করে নিলেও শরীরের ভেতরে সেটি অন্য রূপে পরিণত হতে পারে।

বিজ্ঞানীরা এটা নিশ্চিত হন ১৯৯৫ সালের দিকে। রক্তে আর মানুষের শরীরে ওষুধটা পরীক্ষা করে তারা মেপে দেখেন, মাত্র কয়েক ঘণ্টাতেই এক রূপ অনেকটা বদলে আরেক রূপ হয়ে যায়। মজার ব্যাপার, একসময়ের এই অভিশপ্ত ওষুধই আজ সাবধানে কুষ্ঠ আর এক ধরনের ক্যানসারের চিকিৎসায় কাজে লাগছে।

কেন এতদিন বিজ্ঞানীরা পারছিলেন না

থ্যালিডোমাইডের মত বিপদ এড়াতে দরকার শুধু কাজের হাতের অণুটা বানানো, উল্টাটা বাদ দিয়ে। কিন্তু এটাই ছিল সবচেয়ে কঠিন, আর সমস্যাটা একেবারে গোড়াতেই।

আপনি যদি সাধারণ, কোনো দিকে-না-হেলা কাঁচামাল দিয়ে অণু বানাতে বসেন, তাহলে বিক্রিয়াকে কেউ বলে দেয় না কোন হাত বাছতে হবে। ডান আর বাম, দুটিই তৈরি হয় ঠিক সমান সমান। পাস্তুরের মত হাতে বেছে আলাদা করা যায়, কিন্তু কারখানায় কোটি কোটি দানা চিমটে দিয়ে বাছা তো অসম্ভব।

পুরানো উপায়গুলিও ছিল খরচে ভারি আর অপচয়ে ভরা। হয় পুরাটা বানিয়ে অর্ধেক ফেলে দাও, নয়ত প্রকৃতি থেকে পাওয়া দামি একমুখী কাঁচামাল খোঁজো, কিংবা পণ্যের সমান পরিমাণ 'সহায়ক' অণু ঢালো। কিন্তু যতটা জিনিস বানাবেন ঠিক ততটাই সহায়ক লাগে বলে খরচ আর অপচয়, দুটিই বেশি।

বিজ্ঞানীদের আসল স্বপ্ন ছিল অন্য রকম। সামান্য একটুখানি অনুঘটক দিয়ে অনেকটা একমুখী পণ্য বানানো। অনুঘটক নিজে প্রায় খরচ না হয়েও বিক্রিয়াটাকে চালু করে দেয় বা এগিয়ে নেয়, অনেকটা রাঁধুনির মত, যে নিজে খাবার না হয়েও রান্নাটা হতে সাহায্য করে।

কিন্তু এখানেই গেঁথে ছিল এক ভুল বিশ্বাস। সবাই ধরে নিতেন, অনুঘটক যতটা বিশুদ্ধ, পণ্যও ঠিক ততটাই বিশুদ্ধ হবে, এর বেশি নয়। মানে, আধা-মেশানো অনুঘটক দিয়ে আধা-মেশানো ফলই পাওয়া যাবে। এই 'সোজা হিসাবের' বিশ্বাসটাই ছিল সবচেয়ে বড় দেয়াল।

কাগাঁ ঠিক কী করলেন, আর কীভাবে

এ বছর রসায়নে নোবেল পেয়েছেন দুজন। ফ্রান্সের অঁরি কাগাঁ (জন্ম ১৯৩০) আর জাপানের কেনসো সোয়াই (জন্ম ১৯৫০)। প্রথম বড় ধাক্কাটা দেন কাগাঁ, ১৯৮৬ সালে। মজার ব্যাপার, ২০০১ সালে এই অসম-রসায়নের কাজেই নোবেল দেওয়া হলে কাগাঁকে বাদ দেওয়া নিয়ে বেশ বিতর্ক হয়েছিল। শেষমেশ মূল কাজের প্রায় ৪০ বছর পর, নব্বই পেরোনো বয়সে, সম্মানটা তার ঘরে এল।

তিনি ওই 'সোজা হিসাবের' বিশ্বাসটাকেই পরীক্ষা করে দেখতে চাইলেন। ইচ্ছে করে খানিকটা মেশানো, মানে পুরো বিশুদ্ধ নয় এমন অনুঘটক নিয়ে বিক্রিয়া চালালেন। ফল দেখে সবাই চমকে গেল। অনুঘটকে এক হাতের সামান্য বাড়তি থাকলেও পণ্যে সেই হাতের আধিক্য হয়ে যাচ্ছে অনেক অনেক বেশি। অনুঘটকের ছোট্ট ঝোঁকটাও ঠিক এভাবে পণ্যে এসে বিরাট হয়ে ওঠে। অনুঘটকের চেয়ে পণ্যটাই বেশি একমুখী!

সোজা পথে না চলে হিসাবটা বেঁকে যাচ্ছিল বলে একে নাম দেওয়া হল অরৈখিক প্রভাব (nonlinear effect)। কারণটা কাগাঁ অঙ্ক কষে বুঝিয়ে দিলেন। অনুঘটকের অণুরা কাজ করার সময় জোড়ায় জোড়ায় মেলে। একটা ডান আর একটা বাম পাশাপাশি এলে তারা একে অন্যকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে এমন একটা জোড়া বানায়, যেটা আর কোনো কাজে লাগে না, যেন দুজন মিলে নিজেরাই নিজেদের এক কোণে বসিয়ে রাখে।

ফলে যে হাতটা সংখ্যায় বেশি, তার বাড়তি অণুগুলি সঙ্গী না পেয়ে একা থেকে যায়, আর ওরাই খোলা মাঠে কাজ করার সুযোগ পায়। তাই সেই হাতের দাপটই ফুটে ওঠে ফলাফলে।

সোয়াই ঠিক কী করলেন, আর কীভাবে

কাগাঁর কাজ দেখে দুনিয়াজুড়ে অনেকে নড়েচড়ে বসলেন। তাদেরই একজন জাপানের কেনসো সোয়াই। তিনি ভাবলেন আরও এক ধাপ এগিয়ে।

১৯৯৫ সালে সোয়াই বানালেন অদ্ভুত এক বিক্রিয়া। সেখানে তৈরি হওয়া পণ্যটাই নিজেকে বানানোর অনুঘটক হয়ে ওঠে। মানে, একবার খানিকটা পণ্য তৈরি হলে সে-ই পরেরটা বানাতে সাহায্য করে, তারপর ওরা দুজন মিলে আরও বানায়, আর এভাবে দলটা নিজে থেকেই ফুলতে থাকে। বিজ্ঞানে একে বলে স্ব-অনুঘটন (autocatalysis)।

ফলটা ছিল রীতিমত নাটকীয়। শুরুতে এক হাতের ভাগ ছিল সামান্যই বেশি। একশোটা অণুর মধ্যে ধরুন এক হাতের ৫১টা, অন্য হাতের ৪৯টা। ফারাক মোটে ২টা, প্রায় সমান সমান বলা চলে। কয়েক দফা পরেই সেটা পৌঁছে গেল ৮৭ শতাংশে। আর বারবার চালালে প্রায় ৯৯.৯৯ শতাংশ, অর্থাৎ কার্যত পুরাপুরি এক হাতে। পাহাড়ের গা বেয়ে গড়িয়ে পড়া ছোট্ট একটা তুষারের দলা যেভাবে বিশাল বরফস্তূপ হয়ে যায়, খানিকটা সেরকম।

সবচেয়ে চমকপ্রদ দিকটা হল, এই বিক্রিয়া এত সংবেদনশীল যে একদম মৃদু একটা ধাক্কাতেও সে কোন হাত বাছবে তা ঠিক হয়ে যায়। সেই ধাক্কা হতে পারে এমন আলো, যার নিজেরই একটা প্যাঁচ আছে, ডান দিকে বা বাম দিকে ঘোরানো। কিংবা পাশে রাখা এমন একটা স্ফটিক, যেটা নিজেই এক হাতের, মানে এক দিকে হেলানো। এটুকু ইশারাই বিক্রিয়াটিকে বলে দেয় কোন পথে এগোতে হবে।

এটা কাজে লাগে কোথায়

এই আবিষ্কার শুধু বইয়ের পাতার জিনিস নয়। আপনার প্রতিদিনের জীবনের নানা জায়গায় এর ছোঁয়া আছে। ল্যাব থেকে বেরিয়ে এই কৌশল সত্যিকার কারখানায় জোরেশোরে কাজে লাগতে শুরু করে ১৯৯০-এর দশক থেকে, বিশেষ করে যখন ওষুধের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলি শুধু কাজের হাতের ওষুধ বানানোর ওপর জোর দিতে থাকে। তার আগে প্রথম বড় শিল্প-প্রয়োগ ছিল ১৯৭০-এর দশকে, পারকিনসনের ওষুধ এল-ডোপা বানানোয়।

• ওষুধ। আজকের বাজারের প্রায় অর্ধেক ওষুধই কাইরাল, অর্থাৎ এদের ডান আর বাম দুই রূপ আছে। তাই বেশিরভাগ ওষুধই এখন বানানো হয় এই নিয়ম মেনে। ব্যথার ওষুধ আইবুপ্রোফেনের দুটি রূপের মধ্যে কেবল একটাই কাজ করে। ন্যাপ্রোক্সেন নামের আরেকটা ব্যথানাশকের বেলায় ব্যাপারটা আরও কড়া।

এক রূপ ব্যথা সারায়, উল্টা রূপ আবার লিভারের ক্ষতি করতে পারে। পারকিনসন রোগের ওষুধ এল-ডোপাও তেমনি। তাই ওষুধ কোম্পানিগুলি এখন ইচ্ছে করে শুধু কাজের হাতটাই বানায়, আর তাতেই ওষুধ বেশি নিরাপদ।

• ভিটামিন। ভিটামিন সি-র একটা রূপই আপনার শরীর ঠিকমত কাজে লাগাতে পারে, উল্টা রূপটা প্রায় বৃথা। ভাল ভিটামিন বানাতে গেলেও তাই সঠিক হাতটা চাই।

• খাবারের স্বাদ। কৃত্রিম চিনি অ্যাসপার্টেমের এক রূপ মিষ্টি, আরেক রূপ তেতো বা স্বাদহীন। রান্নায় স্বাদ বাড়ানো টেস্টিং সল্টের (মনোসোডিয়াম গ্লুটামেট) বেলাতেও শুধু একটা রূপই জিভে ওই মজাদার স্বাদ আনে, অন্যটা একদম পানসে।

• গন্ধ। লেবু আর কমলার ঘ্রাণের পেছনে আছে লিমোনিন নামের একই একটা অণু। এক হাতে পাবেন কমলার গন্ধ, হুবহু উল্টো হাতে লেবুর। কারভোনের বেলায়ও তাই, এক রূপে পুদিনার ঠান্ডা ঘ্রাণ আর আয়না-রূপে জিরার ঝাঁঝ। একই অণু, শুধু হাত বদলে গন্ধ পাল্টে গেল!

• সুগন্ধি। পারফিউমের মিষ্টি গন্ধও নির্ভর করে অণুর সঠিক রূপের ওপর। ভুল রূপে গন্ধটাই বদলে যেতে পারে।

• কৃষি। ফসলের কীটনাশক আর আগাছানাশকে এখন শুধু কার্যকর রূপটা বানানো যায়। অল্পেই কাজ হয় বলে কম রাসায়নিক লাগে, পরিবেশেরও কম ক্ষতি হয়।

• নতুন উপকরণ ও গবেষণা। কিছু প্লাস্টিক আর পদার্থের শক্তি-দৃঢ়তা নির্ভর করে তার ছোট্ট অণুগুলি কোন হাতে সাজানো তার ওপর। নিখুঁতভাবে একমুখী অণু বানানোর এই ক্ষমতা গবেষণাগারে নতুন নতুন জিনিস তৈরির পথও খুলে দিয়েছে।

একটা প্রশ্ন বিজ্ঞানীদের বহুদিন ভাবিয়েছে। প্রাণের জগতে প্রায় সব অণুই এক হাতের। মানে, প্রতিটা অণুর দুটি করে আয়না-রূপ থাকতে পারলেও প্রাণ প্রতিবার একটাই বেছে নেয়। যেন গোটা প্রাণজগৎ আগেভাগে একটা দিক বেছে নিয়েছে। শুরুটা হল কী করে? পাস্তুর সমস্যাটা চোখে দেখিয়েছিলেন। কাগাঁ দেখালেন সামান্য হেরফেরও কীভাবে বড় হয়ে ওঠে। আর সোয়াই দেখালেন, একটা বিক্রিয়া নিজে নিজেই কীভাবে পুরোপুরি এক হাতে গিয়ে দাঁড়ায়।

এই তিন ধাপ মিলিয়ে মানুষ এখন ইচ্ছেমত সেই হাতটা বেছে নিতে পারে, তা-ও কম খরচে, কম ভুলে, বিশুদ্ধভাবে। আর প্রাণের একটা পুরোনো রহস্যেও খানিকটা আলো পড়ল—প্রাণ কেন একমুখী। কোটি কোটি বছর আগে শুরুতে হয়ত ডান আর বাম প্রায় সমান সমানই ছিল। সোয়াইয়ের কাজ দেখিয়ে দেয়, সামান্য একটা ঝোঁক পেলেই প্রকৃতি নিজে নিজে সেটাকে বাড়িয়ে পুরাপুরি এক হাতে নিয়ে যেতে পারে।

প্রাণের শুরুতেও হয়ত এভাবেই একটা হাত জিতে গিয়েছিল। আর সেই প্রথম সামান্য ঝোঁকটা কোথা থেকে এসেছিল? একটা চমকপ্রদ অনুমান বলছে, হয়ত মহাকাশ থেকেই। পৃথিবীতে পড়া কিছু উল্কাপিণ্ডের ভেতরের অ্যামিনো অ্যাসিডে বিজ্ঞানীরা 'বামহাতি' রূপের সামান্য আধিক্য পেয়েছেন। এ জন্যই রসায়নের সবচেয়ে বড় সম্মানটা এবার কাগাঁ আর সোয়াইয়ের ঘরে।

#রসায়ন #নোবেল #অণু

নোবেল ২০২৬: পদার্থবিজ্ঞানআলো যেখানে ব্যর্থ, দূর মহাবিশ্বের সেই খবর নিয়ে আসছে অদৃশ্য নিউট্রিনোরাতের আকাশে আমরা তারকা ও গ্...
07/10/2026

নোবেল ২০২৬: পদার্থবিজ্ঞান
আলো যেখানে ব্যর্থ, দূর মহাবিশ্বের সেই খবর নিয়ে আসছে অদৃশ্য নিউট্রিনো

রাতের আকাশে আমরা তারকা ও গ্যালাক্সি দেখি। এসব আলো দেখে বিজ্ঞানীরা মহাবিশ্বে কী ঘটছে, তার অনেক কিছু জানতে পারেন। কিন্তু সব মহাজাগতিক ঘটনার খবর আলো আমাদের কাছে পৌঁছে দিতে পারে না। কিছু জায়গা এত ঘন যে আলো সেখানে আটকে যায় বা ছড়িয়ে পড়ে।

সেই অদৃশ্য জায়গাগুলির খবর পাওয়ার একটি উপায় আছে। তার নাম নিউট্রিনো।

নিউট্রিনো অত্যন্ত ক্ষুদ্র এক কণা। এর কোনো বৈদ্যুতিক চার্জ বা আধান নেই। চার্জ হল কণার এমন একটি বৈশিষ্ট্য, যার কারণে সেটি অন্য চার্জযুক্ত কণাকে টানতে বা ঠেলতে পারে এবং বৈদ্যুতিক ও চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের প্রভাবে তার গতিপথ বদলে যায়। ইলেকট্রনের ঋণাত্মক চার্জ আছে, প্রোটনের আছে ধনাত্মক চার্জ; নিউট্রিনোর এর কোনোটাই নেই।

একটি নিউট্রিনো পৃথিবীর এক পাশ দিয়ে ঢুকে অন্য পাশ দিয়ে বেরিয়ে যেতে পারে, অথচ পথে পৃথিবীর বিপুল পরিমাণ পদার্থের সঙ্গে কোনো মিথস্ক্রিয়া নাও ঘটতে পারে। কারণ সাধারণ পদার্থের সঙ্গে নিউট্রিনোর মিথস্ক্রিয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম। তাই এমন অসংখ্য নিউট্রিনো প্রতিনিয়ত পৃথিবীর মধ্য দিয়ে চলে গেলেও তাদের যাত্রাপথের কোনো সরাসরি চিহ্ন আমরা দেখতে পাই না।

পরমাণুর ভেতরে কী আছে

এই নিউট্রিনোর গল্প বুঝতে হলে আমাদের একটু পেছনে যেতে হবে, পরমাণুর ভেতরে। কারণ নিউট্রিনোর ধারণা এসেছিল পরমাণুর নিউক্লিয়াস নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে।

আমাদের চারপাশের সবকিছুই পরমাণু দিয়ে তৈরি। ১৯১১ সালে আর্নেস্ট রাদারফোর্ডের পরীক্ষায় জানা গেল, পরমাণুর মাঝখানে রয়েছে ছোট একটি কেন্দ্র—নিউক্লিয়াস। এর ভেতরে থাকে প্রোটন ও নিউট্রন। আর নিউক্লিয়াসের চারপাশে থাকে ইলেকট্রন।

এরপর বিজ্ঞানীরা নিউক্লিয়াস নিয়েই আরও পরীক্ষা করতে শুরু করলেন। তারা দেখলেন, কিছু নিউক্লিয়াস স্থির থাকে না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এগুলি নিজেরাই বদলে যায় এবং এই পরিবর্তনের সময় কণা ও শক্তি বের হয়। এই ঘটনাকে বলা হয় তেজস্ক্রিয় ক্ষয়।

তেজস্ক্রিয় ক্ষয়ের একটি ধরন হল বিটা ক্ষয় (β ক্ষয়)। এতে নিউক্লিয়াসের একটি নিউট্রন প্রোটনে রূপান্তরিত হয় এবং সাথে সেখান থেকে একটি ইলেকট্রন বেরিয়ে আসে। একই সঙ্গে বেরিয়ে যায় আরেকটি কণা—অ্যান্টিনিউট্রিনো।

এবার বিজ্ঞানীদের নতুন প্রশ্ন—বেরিয়ে আসা ইলেকট্রনটির শক্তি কত?

ইলেকট্রনের শক্তি মাপার চেষ্টা

১৯১৪ সালে জেমস চ্যাডউইক বিটা ক্ষয়ে বেরিয়ে আসা ইলেকট্রনের শক্তি মাপার জন্য চৌম্বক বর্ণালিবীক্ষণ পদ্ধতি ব্যবহার করেন। ইলেকট্রনকে একটি চৌম্বক ক্ষেত্রের মধ্যে পাঠালে তার বৈদ্যুতিক চার্জের কারণে চলার পথ বাঁকে।

একই চৌম্বক ক্ষেত্রে বেশি শক্তির ইলেকট্রন কম বাঁকে, আর কম শক্তির ইলেকট্রন বেশি বাঁকে। তাই তার পথ কতটা বাঁকছে তা মেপে ইলেকট্রনের শক্তি ও ভরবেগ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

চ্যাডউইক দেখলেন, বিটা ক্ষয়ে সব ইলেকট্রন একই শক্তি নিয়ে বের হচ্ছে না। তাদের শক্তি একটি নির্দিষ্ট মানে আটকে নেই; বরং একটি ধারাবাহিক পরিসরে ছড়িয়ে আছে। ১৯২৭ সালে চার্লস এলিস ও উইলিয়াম উস্টার অন্য পদ্ধতিতে মোট শক্তি মেপেও এই ফল নিশ্চিত করেন।

এখানেই তৈরি হল বড় প্রশ্ন। বিটা ক্ষয়ের আগে ও পরে শক্তি এবং ভরবেগের হিসাব তো মিলতে হবে। কিন্তু শুধু নিউক্লিয়াস আর ইলেকট্রনকে হিসাবের মধ্যে রাখলে মনে হচ্ছিল, শক্তি ও ভরবেগের কিছু অংশ যেন উধাও হয়ে যাচ্ছে।

তাহলে সেই হারিয়ে যাওয়া শক্তি ও ভরবেগ কোথায় গেল?

অদৃশ্য কণার ধারণা

এই সমস্যার সমাধান খুঁজতে গিয়ে ১৯৩০ সালে অস্ট্রিয়ান পদার্থবিদ উলফগ্যাং পাউলি একটি সাহসী ধারণা দিলেন। তিনি বললেন, বিটা ক্ষয়ের সময় শুধু ইলেকট্রন বের হয় না; তার সঙ্গে আরও একটি অদৃশ্য কণাও বেরিয়ে যায়। এই কণাটি শক্তি ও ভরবেগের কিছু অংশ সঙ্গে নিয়ে যায়। তাই ইলেকট্রনের শক্তি কখনও বেশি, কখনও কম হলেও মোট হিসাব ঠিক থাকে।

পাউলি কণাটিকে দেখেননি; ইলেকট্রনের মাপা ফলাফলের হিসাব থেকেই তার অস্তিত্ব অনুমান করেছিলেন। পরে ইতালীয় পদার্থবিদ এনরিকো ফের্মি ১৯৩৩-৩৪ সালে পাউলির ধারণাকে বিটা ক্ষয়ের একটি পূর্ণাঙ্গ তত্ত্বে রূপ দেন এবং এই অদৃশ্য কণাটির নাম দেন নিউট্রিনো।

নিউট্রিনো সত্যিই আছে কি

নিউট্রিনোকে সরাসরি দেখা কঠিন, কারণ এটি সাধারণ পদার্থের সঙ্গে খুব কমই মিথস্ক্রিয়া করে। তাই বিজ্ঞানীদের এমন একটি জায়গা দরকার ছিল, যেখানে প্রচুর সংখ্যক নিউট্রিনো তৈরি হয় এবং তাদের মধ্যে কয়েকটি অন্য কোনো কণার সঙ্গে ধাক্কা খাওয়ার সুযোগ পায়।

এমন একটি সুযোগ পাওয়া গেল পারমাণবিক চুল্লিতে। চুল্লির ভেতরে পরমাণুর নিউক্লিয়াসের পরিবর্তনের সময় বিপুল সংখ্যক অ্যান্টিনিউট্রিনো তৈরি হয়। ১৯৫৬ সালে ক্লাইড কোয়ান ও ফ্রেডেরিক রেইনস যুক্তরাষ্ট্রের সাভান্না রিভার পারমাণবিক চুল্লির কাছে একটি বিশেষ ডিটেক্টর বসিয়ে সেই অ্যান্টিনিউট্রিনো ধরার চেষ্টা করেন।

তারা নিউট্রিনোকে সরাসরি দেখতে পাননি। বরং নিউট্রিনো কোনো পদার্থের সঙ্গে ধাক্কা খেলে যে অন্য কণা ও আলো তৈরি হয়, ডিটেক্টর সেই পরোক্ষ চিহ্ন ধরেছিল। পরীক্ষায় এমন সংকেত পাওয়া গেল, যা পাউলির প্রস্তাবিত অদৃশ্য কণার সঙ্গে মিলে যায়।

সূর্যের নিউট্রিনো-রহস্য

নিউট্রিনোর অস্তিত্ব প্রমাণিত হওয়ার পর বিজ্ঞানীরা ভাবলেন, এই কণা যদি এত সহজে পদার্থের মধ্য দিয়ে চলে যেতে পারে, তাহলে সূর্যের ভেতরের খবরও কি এটি আমাদের দিতে পারে?

সূর্যের কেন্দ্রে প্রচণ্ড তাপ ও চাপের মধ্যে পারমাণবিক সংযোজন ঘটে। হাইড্রোজেনের নিউক্লিয়াস মিলিত হয়ে হিলিয়াম তৈরি করে এবং একই সঙ্গে প্রচুর নিউট্রিনোও উৎপন্ন হয়।

বিজ্ঞানীরা সূর্যের ভর, আকার, পৃষ্ঠের তাপমাত্রা, আলো ও অন্যান্য পর্যবেক্ষণ থেকে সূর্যের একটি বৈজ্ঞানিক মডেল তৈরি করেন। মাধ্যাকর্ষণ, তাপ ও পারমাণবিক বিক্রিয়ার নিয়ম ব্যবহার করে সেই মডেল থেকে হিসাব করা যায়, সূর্যের কেন্দ্রে কত সংযোজন ঘটছে এবং কত নিউট্রিনো তৈরি হওয়ার কথা।

বিজ্ঞানীরা ডিটেক্টরে সূর্য থেকে আসা নিউট্রিনো গুনতে শুরু করলেন। কিন্তু দেখা গেল, মডেল থেকে যত ইলেকট্রন নিউট্রিনো আসার কথা, তার প্রায় এক-তৃতীয়াংশই ধরা পড়ছে। তাহলে বাকি নিউট্রিনোগুলি গেল কোথায়?

এটাই পরিচিত হল সোলার নিউট্রিনো সমস্যা নামে। প্রথমে মনে করা হয়েছিল, হয়ত সূর্যের মডেলেই ভুল আছে। কিন্তু মডেল উন্নত করার পরও বিভিন্ন পরীক্ষায় একই ঘাটতি দেখা গেল।

পরে বিজ্ঞানীরা বুঝলেন, নিউট্রিনোগুলি হারিয়ে যায়নি। পৃথিবীতে আসার পথে তারা এক ধরন থেকে অন্য ধরনে বদলে যেতে পারে। সূর্য থেকে ইলেকট্রন নিউট্রিনো হিসাবে বের হওয়া কণার একটি অংশ পথে মিউঅন বা টাউ নিউট্রিনোতে পরিণত হয়। ফলে শুধু ইলেকট্রন নিউট্রিনো শনাক্ত করা ডিটেক্টরে সংখ্যা কম পাওয়া স্বাভাবিক।

পরে তিন ধরনের নিউট্রিনো শনাক্ত করতে সক্ষম পরীক্ষায় দেখা গেল, মোট সংখ্যা সূর্যের মডেলের পূর্বাভাসের সঙ্গে মিলে যায়। এই ঘটনাকে বলা হয় নিউট্রিনো দোলন বা নিউট্রিনো অসিলেশন। এর মাধ্যমে আরও জানা গেল, নিউট্রিনোর ভর শূন্য নয়।

এবার নতুন প্রশ্ন উঠল—সূর্যের ভেতর থেকে যদি নিউট্রিনো প্রায় বাধাহীনভাবে বেরিয়ে আসতে পারে, তাহলে মহাবিশ্বের আরও দূরের ও শক্তিশালী ঘটনাগুলির খবরও কি নিউট্রিনো পৃথিবীতে নিয়ে আসতে পারে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই বিজ্ঞানীদের তাকাতে হল অ্যান্টার্কটিকার বরফের দিকে।

বরফের নিচে নিউট্রিনো ধরার চেষ্টা

নিউট্রিনোর শক্তি বোঝার পর বিজ্ঞানীদের সামনে নতুন লক্ষ্য তৈরি হল—মহাবিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ঘটনাগুলি থেকে আসা উচ্চ-শক্তির নিউট্রিনো খুঁজে বের করা। কিন্তু কাজটি সহজ নয়। নিউট্রিনো এত কমই অন্য কণার সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে যে হাজার হাজার নিউট্রিনো কোনো ডিটেক্টরের মধ্য দিয়ে চলে গেলেও হয়ত একটিও ধরা পড়বে না।

তাই বিজ্ঞানীদের দরকার ছিল এমন একটি বিশাল ডিটেক্টর, যার ভেতর দিয়ে বিপুল সংখ্যক নিউট্রিনো যাওয়ার সুযোগ পাবে। ১৯৮০-এর দশকের শেষদিকে পদার্থবিদ ফ্রান্সিস হালজেন ও তার সহকর্মীরা একটি অপ্রচলিত ধারণা নিয়ে কাজ শুরু করলেন—প্রকৃতির তৈরি গভীর বরফকেই ডিটেক্টরের অংশ হিসাবে ব্যবহার করা যায় কি না।

ধারণাটি প্রথমে ছোট পরিসরে পরীক্ষা করা হয় এএমএএনডিএ প্রকল্পে। বরফের গভীরে আলো-সংবেদনশীল ডিটেক্টর বসিয়ে দেখা হল, নিউট্রিনোর মিথস্ক্রিয়ায় তৈরি আলো শনাক্ত করা যাচ্ছে। এই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আরও বড় ডিটেক্টরের পরিকল্পনা তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত সেই পরিকল্পনাই রূপ নেয় আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরিতে।

আইসকিউব কীভাবে নিউট্রিনো ধরে

আইসকিউব আসলে নিউট্রিনোকে সরাসরি দেখে না। নিউট্রিনো বরফের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় খুব কম ক্ষেত্রেই কোনো পরমাণুর নিউক্লিয়াস বা অন্য কণার সঙ্গে ধাক্কা খায়। কিন্তু এমন একটি সংঘর্ষ ঘটলে নিউট্রিনোর শক্তি থেকে অন্য কণা তৈরি হতে পারে।

এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি কণা হল মিউঅন। মিউঅন বৈদ্যুতিক চার্জযুক্ত। তাই বরফের ভেতর দিয়ে খুব দ্রুত চলার সময় এটি একটি বিশেষ ধরনের আলো তৈরি করে। এই আলোকে বলা হয় চেরেনকভ আলো। চেরেনকভ আলো নামটি এসেছে রুশ পদার্থবিদ পাভেল চেরেনকভের নাম থেকে।

চেরেনকভ ১৯৩৪ সালে এই বিশেষ ধরনের আলোক বিকিরণ পর্যবেক্ষণ করেন; পরে ইলিয়া ফ্রাঙ্ক ও ইগর তাম এর তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দেন। ১৯৫৮ সালে তিনজনই এই কাজের জন্য পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান।

চেরেনকভ আলো তৈরি হয় যখন কোনো চার্জযুক্ত কণা কোনো স্বচ্ছ মাধ্যমে আলোর গতির চেয়ে দ্রুত চলে। তবে কণাটি শূন্যস্থানে আলোর গতির চেয়ে দ্রুত চলে না; বরফের মত মাধ্যমে আলোর গতি কমে যাওয়ায় এই ঘটনা সম্ভব হয়।

আইসকিউবের বরফের গভীরে বসানো হাজার হাজার আলো-সংবেদনশীল যন্ত্র এই ক্ষীণ আলো ধরে। কোন ডিটেক্টরে আলো পৌঁছাল, কখন পৌঁছাল এবং কতটা আলো পাওয়া গেল—এসব তথ্য একসঙ্গে মিলিয়ে কম্পিউটার মিউঅনের চলার পথ বের করতে পারে।

আর মিউঅনের পথ থেকে বিজ্ঞানীরা উল্টা দিকে হিসাব করেন—কোন দিক থেকে নিউট্রিনোটি এসেছিল এবং তার শক্তি কত ছিল।

অর্থাৎ আইসকিউব নিউট্রিনোকে সরাসরি দেখে না; তার রেখে যাওয়া আলোর চিহ্ন থেকে তার শক্তি, গতিপথ এবং মহাবিশ্বের কোন উৎস থেকে এসেছে, তার খবর বের করা হয়।

২০১৩ সালে আইসকিউব মহাজাগতিক উচ্চ-শক্তির নিউট্রিনোর শক্ত প্রমাণ দেয়। ২০১৭ সালে একটি উচ্চ-শক্তির নিউট্রিনোর সঙ্গে টিএক্সএস ০৫০৬+০৫৬ নামের একটি ব্লাজারের তীব্র গামা-রশ্মি বিস্ফোরণের দিক ও সময়ের মিল পাওয়ার পর মহাজাগতিক নিউট্রিনোর একটি সম্ভাব্য বহির্গ্যালাক্টিক উৎস শনাক্ত করার পথ খুলে যায়।

এভাবেই মাল্টিমেসেঞ্জার অ্যাস্ট্রোনমির একটি নতুন অধ্যায় খুলে যায়—একই মহাজাগতিক ঘটনাকে নিউট্রিনো ও আলো, দুদিক থেকেই অনুসরণ করা সম্ভব হয়।

হালজেনের অবদান কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

নিউট্রিনোর অস্তিত্বের ধারণা থেকে আইসকিউব পর্যন্ত এই যাত্রা এক দিনে তৈরি হয়নি। নিউট্রিনোর অস্তিত্ব প্রথমে অনুমান করা হয়েছিল, পরে পরীক্ষায় তা নিশ্চিত হয়। সূর্যের নিউট্রিনো-রহস্য সমাধান করতে গিয়ে জানা গেল, নিউট্রিনো এক ধরন থেকে অন্য ধরনে বদলাতে পারে।

কিন্তু মহাবিশ্বের দূরবর্তী ও অত্যন্ত শক্তিশালী উৎস থেকে আসা উচ্চ-শক্তির নিউট্রিনো শনাক্ত করতে দরকার ছিল সম্পূর্ণ নতুন ধরনের একটি পর্যবেক্ষণকেন্দ্র।

এই পর্যায়ে ফ্রান্সিস হালজেনের ভূমিকা ছিল নির্ণায়ক। তিনি ও তার সহকর্মীরা প্রকৃতির তৈরি গভীর বরফকে নিউট্রিনো শনাক্ত করার মাধ্যম হিসাবে ব্যবহারের ধারণা নিয়ে কাজ শুরু করেন। এএমএএনডিএ পরীক্ষায় সেই ধারণার কার্যকারিতা প্রমাণিত হওয়ার পর তা আরও বড় আকারে আইসকিউব নির্মাণের পথ তৈরি করে।

১৯৯৯ সালে ঘনকিলোমিটার-আকারের আইসকিউব নির্মাণের প্রস্তাবে হালজেন ছিলেন প্রধান তদন্তকারী, আর আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে সংগঠিত করে প্রকল্পটিকে বাস্তব পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

অর্থাৎ হালজেন শুধু একটি ডিটেক্টর তৈরির নেতৃত্ব দেননি; তিনি এমন একটি পদ্ধতিকে বাস্তব রূপ দিয়েছিলেন, যার মাধ্যমে মহাবিশ্বের উচ্চ-শক্তির নিউট্রিনো শনাক্ত করা সম্ভব হয়। আইসকিউব সেই পথেই ২০১৩ সালে মহাজাগতিক নিউট্রিনোর শক্ত প্রমাণ দেয় এবং পরে তাদের সম্ভাব্য উৎস শনাক্ত করার সুযোগ তৈরি করে।

২০২৬ সালের পদার্থবিজ্ঞানের নোবেল পুরস্কারের সরকারি ঘোষণাতেও আইসকিউবে হালজেনের নির্ণায়ক অবদান এবং জ্যোতিঃপদার্থবৈজ্ঞানিক উৎসের উচ্চ-শক্তির নিউট্রিনো আবিষ্কারের কথা বলা হয়েছে।

একসময় যে কণাকে সরাসরি দেখা সম্ভব ছিল না, আজ সেই নিউট্রিনোই মহাবিশ্ব দেখার একটি নতুন জানালা খুলে দিয়েছে—আর সেই জানালার অন্যতম প্রধান স্থাপনা দাঁড়িয়ে আছে পৃথিবীর দক্ষিণ প্রান্তের বরফের নিচে।

#নিউট্রিনো #আইসকিউব #হালজেন

আলো দিয়ে মস্তিষ্কের নিউরন নিয়ন্ত্রণ: যে আবিষ্কারের জন্য চিকিৎসাবিজ্ঞানে ২০২৬ সালের নোবেলমস্তিষ্কের ভেতরটা একবার ভাবুন।...
06/10/2026

আলো দিয়ে মস্তিষ্কের নিউরন নিয়ন্ত্রণ: যে আবিষ্কারের জন্য চিকিৎসাবিজ্ঞানে ২০২৬ সালের নোবেল

মস্তিষ্কের ভেতরটা একবার ভাবুন। কোটি কোটি ছোট ছোট কোষ, নাম নিউরন। এরা নিজেদের মধ্যে বৈদ্যুতিক সংকেত চালাচালি করে, আর সেই চালাচালি থেকেই তৈরি হয় আমাদের চিন্তা, আবেগ, হাত-পা নাড়ানো, সবকিছু।

এখন ধরুন, কোনো একটা নিউরন কোনো একটা আচরণের সঙ্গে জড়িত। এটুকু টের পাওয়া মোটামুটি সহজ। কিন্তু আসল কথাটা অন্য জায়গায়। ওই নিউরনকে যদি ইচ্ছামত চালু করে দেখা যায় আচরণটা ফিরে আসে, আবার বন্ধ করে দিলে থেমে যায়, তবেই জোর দিয়ে বলা যায়—হ্যাঁ, কাজটা ওই নিউরনই করছে।

বছরের পর বছর মস্তিষ্কবিজ্ঞানীরা এখানেই আটকে ছিলেন। মস্তিষ্কের কোথায় কখন কাজ চলছে, সেটা তারা দেখতে পেতেন ঠিকই। কিন্তু নির্দিষ্ট একটা নিউরন বা একদল নিউরনকে আলাদা করে চালু-বন্ধ করা? সেটি পারতেন না।

কেন পারতেন না? কারণটা সহজ। মস্তিষ্কে একসঙ্গে হাজার হাজার, লাখ লাখ নিউরন জেগে থাকে। এই ভিড়ে কে আসল কাজটা করছে আর কে স্রেফ সঙ্গে সঙ্গে সক্রিয় হচ্ছে, পুরোনো পদ্ধতিতে তা আলাদা করার উপায় ছিল না।

সমাধান

সমাধানটা এল একেবারে অন্য দিক থেকে। আলো।

নিউরন তো আর নিজে থেকে আলো চেনে না। তাই অপ্টোজেনেটিক্স (optogenetics) নামের কৌশলটা প্রথমে নির্দিষ্ট নিউরনকে এমনভাবে বদলে দেয় যে সে আলোয় সাড়া দিতে শেখে। এরপর কাজটা সহজ—শুধু আলো ফেললেই নিউরনটা চালু, আলো সরালেই বন্ধ। ঘরের বাতি যেমন রিমোট টিপে জ্বালান-নেভান, অনেকটা তেমন।

এই আলো দিয়ে নিউরন নিয়ন্ত্রণের ভিত্তি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্যই কার্ল ডেইসেরথ, পিটার হেগেমান ও গেয়র্গ নাগেল পেয়েছেন ২০২৬ সালের চিকিৎসাবিজ্ঞানের নোবেল।

নোবেল কমিটির ভাষায়, পুরস্কারটি আলো-নিয়ন্ত্রিত আয়ন চ্যানেল এবং অপ্টোজেনেটিক্স-সংক্রান্ত আবিষ্কারের জন্য। কমিটি বলছে, এই কাজ জীবন্ত মস্তিষ্কে আলাদা আলাদা নিউরন নিয়ন্ত্রণের দরজা খুলে দিয়েছে, আর স্মৃতি-অনুভূতি-আচরণের পেছনের নিউরন-সার্কিট বোঝা অনেকটাই সহজ করেছে।

তিন বিজ্ঞানী কারা

কার্ল ডেইসেরথ কাজ করেন যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে—বায়োইঞ্জিনিয়ারিং ও মনোরোগবিদ্যার অধ্যাপক। গবেষণার পাশাপাশি তিনি রোগীও দেখেন, বিশেষত মন ও মেজাজের সমস্যায়। বাকি দুজন জার্মানির। পিটার হেগেমান বার্লিনের হুমবোল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে বায়োফিজিক্স পড়ান, আর গেয়র্গ নাগেল পড়ান ভুর্ৎসবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে। চ্যানেলরোডপসিন নিয়ে আদি কাজটা এই দুজনের হাতেই শুরু হয়েছিল।

শুরুটা এক শৈবালে

মজার কথা, গল্পের শুরু কিন্তু মস্তিষ্কে নয়। শুরু একটা এককোষী সবুজ শৈবালে।

এই শৈবাল আলো টের পায়, আর আলোর দিকে দিব্যি সাঁতরে যায়। পিটার হেগেমানের মাথায় প্রশ্ন ঘুরল। মস্তিষ্ক নেই, চোখ নেই, এমন একরত্তি জীব আলো বুঝছে কী করে?

গবেষণা করতে গিয়ে হেগেমান ও গেয়র্গ নাগেল একটা আলো-সংবেদনশীল প্রোটিন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেন—নাম চ্যানেলরোডপসিন (channelrhodopsin)। এরই একটা ধরন চ্যানেলরোডপসিন-২। ২০০৩ সালের গবেষণায় ধরা পড়ে, এই জিনিস আলো পেলে কাজ করে। আর তখনই বোঝা যায়, এটা কত বড় ব্যাপার।

জিনিসটা আসলে কোষের দেয়ালে বসানো একটা ছোট্ট দরজা। এই দরজা দিয়ে চার্জওয়ালা কণা, মানে আয়ন, কোষের ভেতরে-বাইরে যাওয়া-আসা করে। মজাটা হল, দরজাটা খোলে আলো পড়লে। নীল আলো গায়ে পড়ল কি পড়ল না, দরজা খুলে গেল, আয়ন হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়ল। আর আয়ন ঢুকতেই বদলে গেল কোষের গোটা বৈদ্যুতিক অবস্থা।

সবচেয়ে কাজের ব্যাপারটা অবশ্য আরও পরে বোঝা গেল। দেখা গেল, এই প্রোটিনের জিন অন্য যেকোনো কোষে বসিয়ে দিলে সেই কোষও আলোয় সাড়া দিতে শুরু করে। মানে, আলো দিয়ে কোষ নিয়ন্ত্রণের একটা চাবি হাতে চলে এল।

নিউরনও কি আলো বুঝবে?

পরের প্রশ্নটা খুব সরল: এই কায়দা কি নিউরনেও খাটবে?

২০০৫ সালে কার্ল ডেইসেরথ, এডওয়ার্ড বয়ডেন, ফেং ঝাং, আর্নস্ট বামবার্গ ও তাদের সহকর্মীরা দেখালেন, চ্যানেলরোডপসিন-২ ব্যবহার করে নিউরনকে আলো দিয়ে সক্রিয় করা যায়।

নিউরন সক্রিয় হলে সে একটা বৈদ্যুতিক ঝলক বা স্পাইক ছাড়ে। গবেষণায় দেখা গেল, আলো দিয়ে এই ঝলক একেবারে মিলিসেকেন্ডের হিসাবে চালানো যায়। অর্থাৎ ঠিক কোন মুহূর্তে নিউরন সাড়া দেবে, সেটাও হাতের মুঠোয়।

মস্তিষ্কে আলো পৌঁছায় কীভাবে

এখানে একটা বাস্তব সমস্যা আছে। মস্তিষ্কের টিস্যু আলোকে সহজে পেরোতে দেয় না, নীল আলো তো অল্প গভীরেই আটকে যায়। তাই বাইরে থেকে আলো ফেলে ভেতরের নিউরন চালানোর উপায় নেই। আলোটাকে ভেতরে পৌঁছে দিতে হয়।

কাজটা হয় সরু একটা অপটিক্যাল ফাইবার দিয়ে—চুলের চেয়ে সামান্য মোটা কাচ বা প্লাস্টিকের সুতা। খুলি ফুটো করে সুতাটা নির্দিষ্ট জায়গায় বসানো হয়, আর বাইরের মাথা যুক্ত থাকে একটা লেজার বা এলইডি-র সঙ্গে।

সেখান থেকে আলো সুতা বেয়ে নিউরনের কাছে যায়—জ্বালালে চালু, নেভালে বন্ধ। তবে মস্তিষ্কের একেবারে উপরিভাগে, কিংবা স্বচ্ছ ছোট প্রাণীতে (যেমন জেব্রাফিশের লার্ভা) ফাইবার লাগে না, বাইরে থেকে সরাসরি আলো ফেললেই চলে।

এখন তারবিহীন পথও আসছে। মস্তিষ্কে বসানো ছোট্ট মাইক্রো-এলইডি চিপ বাইরের সংকেত পেয়ে নিজেই আলো জ্বালায়, সুতার ঝামেলা থাকে না। পাশাপাশি লাল-ঘেঁষা আলোয় সাড়া দেয় এমন প্রোটিনও বানানো হচ্ছে, কারণ লাল আলো টিস্যুতে নীলের চেয়ে বেশি গভীরে ঢোকে।

শুধু জ্বালালে চলবে না, নেভাতেও হবে

তবে মস্তিষ্ক বুঝতে শুধু নিউরন জ্বালিয়ে দিলেই হয় না। কোনো কিছুর আসল ভূমিকা বুঝতে হলে সেটাকে থামিয়েও দেখতে হয়।

এই কারণেই অপ্টোজেনেটিক্সে নানা রকম আলো-সংবেদী প্রোটিন (opsin) কাজে লাগানো হয়। কোনোটা নিউরন জ্বালায়, কোনোটা আবার নিউরন নিভিয়ে দেয়। ২০০৭ সালের গবেষণায় আলো-সংবেদনশীল inhibitory opsin ব্যবহার করে নিউরনের কার্যকলাপ নিষ্ক্রিয় করার উপায়ও দেখানো হল।

ফলে গবেষকের হাতে চলে এল দুটি বোতাম—'চালু' আর 'বন্ধ'। প্রশ্ন আর 'এই নিউরন কখন জাগে?'-তে আটকে রইল না। এবার জিজ্ঞেস করা গেল, 'জাগালে কী হয়?' আর 'থামালে কী হয়?' এই দুই ধরনের পরীক্ষার ফল পাশাপাশি রাখলে কোনো নিউরনের ভূমিকা সম্পর্কে আরও শক্ত প্রমাণ পাওয়া যায়।

'সঙ্গে ঘটা' আর 'ঘটানো' দুটি কিন্তু আলাদা

ভাবুন তো, রাস্তায় অ্যাম্বুলেন্স দেখলে আপনি বুঝে যান আশেপাশে কোথাও দুর্ঘটনা হয়েছে। কিন্তু অ্যাম্বুলেন্স কি দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে? মোটেই না, সে তো ঘটনার পরে এসে হাজির। দুটি জিনিস একসঙ্গে চোখে পড়া আর একটা আরেকটাকে ঘটানো, এক কথা নয়।

মস্তিষ্কেও ঠিক এই ফাঁদ। ধরুন, কোনো প্রাণী ভয় পেলে তার মস্তিষ্কের একটা নির্দিষ্ট নিউরন-সার্কিট জেগে ওঠে। এটুকু দেখে বড়জোর বলা যায়, সার্কিটটার সঙ্গে ভয়ের একটা যোগ আছে। কিন্তু সার্কিটটাই ভয়ের কারণ কি না, তা তো বলা গেল না।

অপ্টোজেনেটিক্স এখানে ঠিক সুইচের কাজটা করে দেয়। গবেষক সার্কিটটা জ্বালিয়ে দেখেন প্রাণী ভয় পায় কি না, আবার নিভিয়ে দেখেন ভয় কমে কি না। এভাবেই 'সম্পর্ক' পেরিয়ে 'কারণ' পর্যন্ত পৌঁছানো যায় (causal relationship)।

জীবন্ত মস্তিষ্কে আলো

২০০৫ সালের কাজের পর ব্যাপারটা দ্রুত গড়াল জীবন্ত প্রাণীর মস্তিষ্কের দিকে। পরবর্তী গবেষণাগুলোতে সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয়—দুই ধরনের আলো-সংবেদনশীল প্রোটিন ব্যবহার করে জীবন্ত প্রাণীর মস্তিষ্কে নির্দিষ্ট নিউরন ও সার্কিট নিয়ন্ত্রণের সম্ভাবনা দেখানো হল।

স্মৃতি, আবেগ, ভয়ের পেছনে

অপ্টোজেনেটিক্স হাতে পেয়ে গবেষকেরা এমন সব নিউরন-সার্কিট নিয়ে নাড়াচাড়া করেছেন, যারা স্মৃতি, আবেগ, পুরস্কার কিংবা ভয়ের সঙ্গে জড়িত। উদ্দেশ্য শুধু দেখা নয়। কোনো সার্কিট জ্বালালে বা থামালে প্রাণীর আচরণ কোন দিকে মোড় নেয়, তা হাতেনাতে পরখ করা।

এই ক্ষমতাটা মস্তিষ্কের রোগ বোঝার গবেষণায় একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। স্নায়ু আর মনের নানা রোগের (neurological ও psychiatric disorder) পেছনে তো সাধারণত একটা কোষ নয়, বরং একদল নিউরনের জট পাকানো যোগাযোগ কাজ করে। সেই জট আলাদা করে পরীক্ষা করার শক্ত হাতিয়ার দিয়েছে এই পদ্ধতি।

চিকিৎসার আশা আছে, তবে তাড়াহুড়া নয়

অপ্টোজেনেটিক্স এখনও মূলত গবেষণার হাতিয়ার, তবে চিকিৎসায় এর সম্ভাব্য ব্যবহার নিয়েও গবেষণা ও ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা চলছে।

বিশেষ করে কিছু ধরনের দৃষ্টিশক্তি হারানোর ক্ষেত্রে আলো-সংবেদনশীল প্রোটিন ব্যবহার করে চোখের কোষকে আবার আলোতে সাড়া দেওয়ানোর চেষ্টা হয়েছে। নোবেল কমিটিও দৃষ্টি ফেরানোর সম্ভাব্য প্রয়োগের কথা বলেছে।

তবে এখানে একটু সাবধান। এসব এখনও গবেষণা আর পরীক্ষার ঘরেই। পদ্ধতিটা দৃষ্টি ফেরানোর আশা জাগিয়েছে ঠিকই, কিন্তু এখনই মানুষের চোখে আলো ফিরিয়ে দিচ্ছে, এমন ভাবলে ভুল হবে।

পুরস্কার এত দেরিতে কেন?

এখানে একটা প্রশ্ন স্বাভাবিক। মূল মাইলস্টোনগুলি ২০০৩ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে তৈরি হয়েছিল, আর ‘অপ্টোজেনেটিক্স’ শব্দটি ২০০৬ সালে এই নতুন পদ্ধতির নাম হিসাবে ব্যবহৃত হতে শুরু করে। তাহলে নোবেল আসতে প্রায় বিশ বছর গড়াল কেন?

এর একটি কারণ হল, এই কাজের গুরুত্ব শুধু প্রাথমিক পরীক্ষায় নয়, পরবর্তী দুই দশকের গবেষণায় আরও স্পষ্ট হয়েছে। নতুন একটা কৌশল সত্যিই টিকবে কি না, সময় না গেলে তা বোঝা যায় না। ২০০৩ থেকে ২০০৭ সালের ধারাবাহিক গবেষণার পর অপ্টোজেনেটিক্স দ্রুত বিস্তৃত হয়ে বিশ্বজুড়ে নিউরোসায়েন্স গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ একটি পদ্ধতিতে পরিণত হয়েছে। ঘোষণার দিনও কমিটি ঠিক এই কথাটাই বলেছে। অর্থাৎ গুরুত্বটা পাকা হতে বছর গড়িয়েছে।

একটা শৈবাল এত বড় হয়ে গেল কী করে

২০২৬ সালের এই নোবেলের সবচেয়ে সুন্দর দিকটা সম্ভবত পুরো যাত্রাপথটাই।

একটা একরত্তি শৈবাল আলোর দিকে সাঁতরায়। বিজ্ঞানীরা ভাবলেন, কী করে? সেই কৌতূহল থেকেই হাতে এল চ্যানেলরোডপসিন। তারপর দেখা গেল, এর জিন অন্য কোষে বসালে সেই কোষও আলো চেনে। বিজ্ঞানীরা সেটা নিউরনে বসালেন, আর নিউরন আলোয় সাড়া দিল। এরপর আলো দিয়েই নিউরন নিয়ন্ত্রণ করা গেল। আর সেখান থেকেই জন্ম নিল অপ্টোজেনেটিক্স।

একটা শৈবালের আলো চেনার এই প্রক্রিয়া এভাবেই হয়ে উঠল মানুষের মস্তিষ্ক বোঝার একটি শক্তিশালী গবেষণার হাতিয়ার।

সামনে কী কী দরজা খুলতে পারে

রোগের সার্কিট বোঝা, দৃষ্টি ফেরানো, স্মৃতি আর শেখার কলকবজা খোঁজা—যে পথগুলির কথা এতক্ষণ বলা হল, সামনে এগুলি ধরেই আরও নির্দিষ্ট চিকিৎসার আশা। আর ব্যাপারটা শুধু মস্তিষ্কেই আটকে নেই। নিউরনের বাইরে অন্যান্য উত্তেজনাশীল কোষ ও টিস্যু নিয়ন্ত্রণেও আলো-ভিত্তিক পদ্ধতি খাটবে কি না, তা নিয়েও গবেষণা চলছে।

তবে এর বেশির ভাগই এখনও সম্ভাবনা, হাতে-পাওয়া ফল নয়।

নোবেলটার আসল মানে

২০২৬ সালের এই নোবেলকে শুধু 'আলো দিয়ে মস্তিষ্ক নিয়ন্ত্রণ' বলে সারলে আসল কথাটাই চাপা পড়ে যায়।

আসল বদলটা এই। বিজ্ঞানীরা এখন মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশ শুধু দেখছেন না, হাতে ধরে নেড়েচেড়ে পরীক্ষা করছেন। আগে তারা ছিলেন দর্শক, এখন হাতে চালু-বন্ধের বোতাম।

তাই ডেইসেরথ, হেগেমান আর নাগেলের কাজের দাম কেবল একটা নতুন প্রযুক্তিতে নয়। তারা এমন একটা পরীক্ষার রাস্তা খুলে দিয়েছেন, যা দিয়ে জীবন্ত মস্তিষ্কের নিউরন, সার্কিট আর আচরণের সম্পর্ক আগের চেয়ে ঢের স্পষ্ট করে বোঝা যায়।

আর গোটা গল্পটার শুরু মানুষের মস্তিষ্কে নয়, একটা ছোট্ট সবুজ শৈবাল আলো চেনে কী করে, নেহাত সেই একটা প্রশ্নে।

#নোবেল #মস্তিষ্ক #আলো

Address

City Bank Center, 28, Gulshan Avenue, Gulshan 1, Bangladesh
Dhaka
1212

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Citytouch posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Contact The Business

Send a message to Citytouch:

Shortcuts

Share