Citytouch

Citytouch Digital Banking Service from City Bank brings you the simplest way to handle banking.

চাকরি নাকি স্টার্টআপ?বিশ থেকে পঁচিশ বছর বয়সটাই হল নিজের ক্যারিয়ারের ভিত্তি গড়ার আসল সময়। এই বয়সে নেওয়া একটি সিদ্ধান্তই প...
05/06/2026

চাকরি নাকি স্টার্টআপ?

বিশ থেকে পঁচিশ বছর বয়সটাই হল নিজের ক্যারিয়ারের ভিত্তি গড়ার আসল সময়। এই বয়সে নেওয়া একটি সিদ্ধান্তই পুরো ভবিষ্যতের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। কিন্তু জীবনের এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে কোন পথে ঝুঁকি নেওয়া উচিত—কর্পোরেট লাইফের চেনা নিরাপত্তা, নাকি নিজের স্বপ্নের স্টার্টআপ? আপনার যৌক্তিক মতামতটি কমেন্টে শেয়ার করুন।

তাপ: এআই যুগের অদৃশ্য সংকটএআই শিল্পের সবচেয়ে বড় সমস্যা কী? অনেকেই বলবেন চিপের সংকট, কেউ বলবেন বিদ্যুতের চাহিদা, আবার ক...
31/05/2026

তাপ: এআই যুগের অদৃশ্য সংকট

এআই শিল্পের সবচেয়ে বড় সমস্যা কী? অনেকেই বলবেন চিপের সংকট, কেউ বলবেন বিদ্যুতের চাহিদা, আবার কারও মতে সবচেয়ে বড় বাধা ডেটা সেন্টার তৈরির বিপুল খরচ। কিন্তু এই শিল্পের প্রকৌশলীদের একটি বড় অংশের কাছে উত্তরটা অন্য রকম—‘তাপ’।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য ব্যবহৃত আধুনিক চিপগুলি প্রতি সেকেন্ডে বিপুল পরিমাণ গণনা করে। এই কাজ করতে গিয়ে এগুলি প্রচুর বিদ্যুৎ খরচ করে, আর সেই শক্তির বড় একটি অংশ শেষ পর্যন্ত তাপে পরিণত হয়। তাই চিপ ঠাণ্ডা রাখার বিষয়টি এখন আর শুধু একটি প্রযুক্তিগত সমস্যা নয়। এটি নিজেই একটি বিশাল শিল্পে পরিণত হচ্ছে।

আজকের ডেটা সেন্টারগুলিতে পরিস্থিতি এমন যে মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রায় ৩০ শতাংশ বা তারও বেশি খরচ হতে পারে শুধু সার্ভার ঠান্ডা রাখার জন্য। এর পেছনের বিজ্ঞানটাও খুব সহজ। কোনো যন্ত্র যত বেশি শক্তি ব্যবহার করবে, তত বেশি তাপ উৎপন্ন করবে।

এখন এআই মডেল প্রশিক্ষণ ও পরিচালনার জন্য ব্যবহৃত জিপিইউ এবং অন্যান্য এআই অ্যাক্সিলারেটর এত বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করে যে এখন শুধু কর্মক্ষমতা বাড়ালেই হচ্ছে না, সেই সঙ্গে অতিরিক্ত তাপ কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে, সেটিও চিপ ডিজাইনের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।

বাতাসের সীমা কোথায়?

বহু বছর ধরে ডেটা সেন্টার ঠাণ্ডা রাখার প্রধান উপায় ছিল এয়ার কুলিং। সার্ভারের র‍্যাকগুলির মাঝখান দিয়ে ঠাণ্ডা বাতাস প্রবাহিত করা হয়, আর চিলার বা এয়ার কন্ডিশনার গরম বাতাস বের করে দিয়ে নতুন করে ঠাণ্ডা বাতাস পাঠায়। কয়েক দশক ধরে এই ব্যবস্থাই বেশ ভালভাবে কাজ করেছে।

একই আকারের চিপের মধ্যে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি ট্রানজিস্টর আর কম্পিউটিং ক্ষমতা ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আধুনিক এআই জিপিইউগুলি তাই কয়েক বছর আগের সার্ভার প্রসেসরের তুলনায় অনেক বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করে।

যে কারণে একই আকারের একটি চিপ থেকেই আগের তুলনায় অনেক বেশি তাপ বের হচ্ছে। আর সেই তাপ শুধু বাতাস দিয়ে সরিয়ে ফেলা কঠিন হয়ে উঠছে।

এ কারণেই প্রযুক্তি শিল্প ধীরে ধীরে এয়ার কুলিং থেকে লিকুইড কুলিংয়ের দিকে ঝুঁকছে। এই পদ্ধতিতে চিপের খুব কাছ দিয়ে ধাতব প্লেট বা পাইপের ভেতর ঠাণ্ডা তরল প্রবাহিত করা হয়। চিপ থেকে তাপ সরাসরি সেই তরলে চলে যায়, তারপর তরলটি বাইরে গিয়ে ঠাণ্ডা হয়ে আবার ফিরে আসে।

তরলটি সরাসরি চিপের ওপর ঢেলে দেওয়া হয় না। এটি প্রবাহিত হয় একটি বিশেষ ধাতব অংশের ভেতর দিয়ে, যাকে বলা হয় কোল্ড প্লেট। কোল্ড প্লেটের ভেতরে অসংখ্য সূক্ষ্ম ও সিল করা চ্যানেল থাকে। চিপ থেকে তাপ সংগ্রহ করে সেই তাপ তরলের কাছে পৌঁছে দেওয়ার মূল কাজটিই করে এই কোল্ড প্লেট।

কিন্তু এখানেও সমস্যা আছে। আধুনিক এআই চিপ এত বেশি তাপ তৈরি করে যে প্রচলিত কোল্ড প্লেট অনেক সময় পুরো চিপকে সমানভাবে ঠাণ্ডা রাখতে পারে না।

তখন কিছু জায়গায় অতিরিক্ত গরম অংশ বা ‘হট স্পট’ তৈরি হয়। আবার কোল্ড প্লেটের ভেতরের চ্যানেল যত জটিল হয়, তরল চালাতে তত বেশি চাপ ও শক্তি লাগে। অর্থাৎ তাপ সরাতে গিয়ে কুলিং ব্যবস্থাই আবার বাড়তি বিদ্যুৎ খরচ শুরু করে।

এই জায়গাতেই গবেষকদের সামনে নতুন একটি প্রশ্ন এসে দাঁড়ায়। ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয়ের গবেষক ফিলিপ মিলকোভিচ এবং তার সহকর্মীরা ভাবতে শুরু করেন, কোল্ড প্লেটের ভেতরের পথগুলি যদি গাছের শিকড়, রক্তনালি কিংবা নদীর শাখা-প্রশাখার মত ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তাহলে কি তাপ আরও দ্রুত এবং সমানভাবে সরানো সম্ভব?

কিন্তু সমস্যা ছিল বাস্তবায়নে। এমন জটিল নকশা প্রচলিত উৎপাদন প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি করা প্রায় অসম্ভব।

গাছের শিকড়, রক্তনালি আর থ্রিডি-প্রিন্টেড তামা

ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয় আরবানা-শ্যাম্পেইনের গবেষকেরা এমন একটি কোল্ড প্লেট তৈরি করতে চেয়েছিলেন, যা প্রচলিত নকশার তুলনায় অনেক বেশি দক্ষভাবে তাপ সরাতে পারে। তবে তাদের লক্ষ্য শুধু আরেকটি নতুন কোল্ড প্লেট বানানো ছিল না।

তারা এমন একটি নকশাকে বাস্তবে রূপ দিতে চেয়েছিলেন, যা এতদিন উৎপাদন প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতার কারণে কেবল ধারণা হিসাবেই ছিল।

একবার গাছের শিকড়, রক্তনালি বা ফুসফুসের বায়ুনালির দিকে তাকালেই বিষয়টি বোঝা যায়। এগুলি সবই অসংখ্য শাখা-প্রশাখায় বিভক্ত, যাতে তরল বা গ্যাস খুব দক্ষভাবে প্রতিটি অংশে পৌঁছাতে পারে। গবেষকদের মনে প্রশ্ন জাগে, কোল্ড প্লেটের ভেতরের চ্যানেলগুলিও যদি এমনভাবে ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তাহলে কি তাপ আরও দ্রুত এবং সমানভাবে সরানো সম্ভব হবে?

প্রচলিত ড্রিল বা মিলিং মেশিন দিয়ে সোজা বা তুলনামূলক সরল চ্যানেল তৈরি করা যায়। কিন্তু গাছের শিকড়ের মত জটিল, বহুস্তরবিশিষ্ট নেটওয়ার্ক তৈরি করা প্রায় অসম্ভব। সে কারণে বহু বছর ধরে এই ধারণা গবেষণাপত্র আর কম্পিউটার মডেলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।

এ পদ্ধতিতে কম্পিউটারকে একটি লক্ষ্য নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। যেমন, “যত বেশি সম্ভব তাপ সরাও, কিন্তু তরল চলাচলে যত কম সম্ভব বাধা তৈরি করো।” এরপর সফটওয়্যার হাজার হাজার সম্ভাব্য নকশা পরীক্ষা করে দেখে এবং ধাপে ধাপে সবচেয়ে কার্যকর আকৃতিটি বের করে আনে।

মজার বিষয় হল, শেষ পর্যন্ত যে নকশাগুলি পাওয়া যায়, সেগুলি প্রায়ই গাছের শিকড়, রক্তনালি বা প্রবালের মত দেখতে হয়। দেখতে অদ্ভুত লাগলেও পদার্থবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এগুলি অত্যন্ত কার্যকর।

এই ধরনের জটিল নকশা তৈরি করতে গবেষকদের দরকার ছিল তামা। কারণ তামা পৃথিবীর অন্যতম সেরা তাপ পরিবাহী ধাতু। কিন্তু সমস্যা হল, প্রচলিত ধাতব থ্রিডি প্রিন্টিং প্রযুক্তিতে তামা নিয়ে কাজ করাই বেশ কঠিন। লেজারের আলো তামা থেকে সহজে প্রতিফলিত হয়ে যায়, তাই এটি প্রিন্ট করা কঠিন হয়। আবার উচ্চ তাপমাত্রায় বিকৃতি ঘটার ঝুঁকিও থাকে।

তারা ব্যবহার করেন প্রতিষ্ঠানটির Electrochemical Additive Manufacturing বা ECAM প্রযুক্তি। এই পদ্ধতিতে ধাতুকে গলিয়ে আকার দেওয়া হয় না। বরং পানিভিত্তিক একটি ইলেক্ট্রোলাইট দ্রবণ থেকে ধীরে ধীরে তামার স্তর জমিয়ে কাঙ্ক্ষিত আকৃতি তৈরি করা হয়। ফলে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও জটিল গঠন তৈরি করা সম্ভব হয়, সেই সঙ্গে বিকৃতি বা ফাটল তৈরির ঝুঁকিও অনেক কমে যায়।

গবেষক বাজমি এবং তার সহকর্মীদের মতে, এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তারা ৩০ থেকে ৫০ মাইক্রোমিটার পর্যন্ত সূক্ষ্ম গঠন তৈরি করতে পেরেছেন। তুলনা করলে বলা যায়, এটি মানুষের একটি চুলের প্রস্থের চেয়েও ছোট। গবেষণাটি Fabric8Labs-এর সহযোগিতায় পরিচালিত হয়েছে এবং এর অর্থায়ন করেছে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বিভাগ।

একদিকে টপোলজি অপটিমাইজেশন এমন নকশা তৈরি করেছে, যা তাত্ত্বিকভাবে অত্যন্ত দক্ষ। অন্যদিকে ECAM প্রযুক্তি সেই জটিল নকশাকে বাস্তবে তৈরি করার সুযোগ দিয়েছে। বহু বছর ধরে কম্পিউটারের তৈরি আদর্শ নকশা আর বাস্তব উৎপাদন প্রযুক্তির মধ্যে যে ফাঁক ছিল, এই গবেষণা সেই ব্যবধান কমানোর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হয়ে উঠেছে।

৫৫০ মেগাওয়াট থেকে ১১ মেগাওয়াট?

গবেষকদের হিসাব বলছে, বড় একটি ডেটা সেন্টারে সার্ভার ঠাণ্ডা রাখতে যেখানে শত শত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ খরচ হতে পারে, সেখানে তাদের নতুন কুলিং পদ্ধতি ব্যবহার করলে সেই চাহিদা তাত্ত্বিকভাবে মাত্র ১১ মেগাওয়াটের কাছাকাছি নেমে আসতে পারে।

এটি কোনো চালু ডেটা সেন্টারে পাওয়া বাস্তব ফল নয়। সংখ্যাটি এসেছে গবেষকদের মডেলিং ও বিশ্লেষণ থেকে। বাস্তবে প্রযুক্তিটি ব্যবহার শুরু হলে ফল কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। তবু এই হিসাব একটি বিষয় স্পষ্ট করে—ডেটা সেন্টারের কুলিং ব্যবস্থায় উন্নতির সুযোগ এখনও অনেক বড়।

এই সম্ভাবনার মূল কারণ নতুন কোল্ড প্লেটের নকশা। পরীক্ষায় দেখা গেছে, এটি প্রচলিত নকশার তুলনায় আরও দক্ষভাবে তাপ সরাতে পারে। একই সঙ্গে এর ভেতর দিয়ে তরল চলাচলও তুলনামূলক সহজ। তাই শুধু বেশি তাপ অপসারণই সম্ভব হয় না, সেই কাজ করতে শক্তিও লাগে কম।

আজ এআই খাতের অন্যতম বড় সীমাবদ্ধতা হয়ে উঠছে বিদ্যুতের প্রাপ্যতা। বিশ্বের অনেক অঞ্চলে নতুন ডেটা সেন্টার নির্মাণের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ, জমি, পানি এবং অবকাঠামো পাওয়াই কঠিন হয়ে পড়ছে।

যদি কুলিং আরও দক্ষ করা যায়, তাহলে একই পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহার করেই আরও বেশি কম্পিউটিং শক্তি পাওয়া সম্ভব হবে। এর ফলে পরিচালন ব্যয় কমতে পারে, বিদ্যুতের চাপ কমতে পারে, এমনকি কার্বন নিঃসরণও হ্রাস পেতে পারে।

অবশ্য নতুন কোনো প্রযুক্তি আবিষ্কার হলেই যে আগামীকাল থেকে সব ডেটা সেন্টারে সেটি ব্যবহার শুরু হবে, এমন নয়। গবেষণাগারে সফল হওয়া আর শিল্প পর্যায়ে সফল হওয়া এক বিষয় নয়। উৎপাদন সক্ষমতা, দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরযোগ্যতা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং খরচ—সবকিছুই আলাদাভাবে পরীক্ষা করতে হয়।

গবেষণাপত্রেও প্রযুক্তিটি বাণিজ্যিকভাবে কখন ব্যবহার শুরু হতে পারে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময়সূচি দেওয়া হয়নি। ফলে এটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতে এখনও কয়েক বছর সময় লাগতে পারে।

ভবিষ্যতের কম্পিউটিং বিপ্লব শুধু আরও শক্তিশালী চিপের ওপর নির্ভর করবে না। সেটি নির্ভর করবে সেই চিপকে কত দক্ষভাবে ঠাণ্ডা রাখা যায়, তার ওপরও। খুব সম্ভব, আগামী দশকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু উদ্ভাবন প্রসেসরের ভেতরে নয়, বরং প্রসেসরের চারপাশে ঘটবে।

#প্রসেসর #তাপ #এআই

চিনের ইয়াংকু বাঁধ: থ্রিডি প্রিন্টিং ধারণায় তৈরি বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু নির্মাণ ২০২১ সালের ডিসেম্বর। তিব্বত মালভূমির কিংহ...
31/05/2026

চিনের ইয়াংকু বাঁধ: থ্রিডি প্রিন্টিং ধারণায় তৈরি বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু নির্মাণ

২০২১ সালের ডিসেম্বর। তিব্বত মালভূমির কিংহাই প্রদেশের এক নির্জন গিরিখাত, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২,৭০০ মিটার (৮,৮০০ ফুট) উঁচুতে। বাতাসে অক্সিজেন সমতলের তুলনায় অনেক কম। তাপমাত্রা শূন্যের অনেক নিচে। এমন পরিবেশে বড় কোনো নির্মাণকাজ মানেই প্রচণ্ড ঝুঁকি—অক্সিজেনের ঘাটতি, হঠাৎ তুষারঝড়, আর পাহাড়ি অঞ্চলে বাঁধ নির্মাণের সহজাত বিপদ তো আছেই।

কিন্তু সেদিন কাজ থেমে ছিল না। নির্মাণস্থলে একে একে চালু হয়েছিল বিশাল সব যন্ত্র। ট্রাক চলতে শুরু করেছিল, বুলডোজার মাটি সরাচ্ছিল, রোলার স্তর সমান করে চাপ দিচ্ছিল। কিন্তু পুরো দৃশ্যটার মধ্যে একটা অস্বাভাবিক ব্যাপার ছিল—কোনো যন্ত্রের স্টিয়ারিংয়ে মানুষ নেই। কোনো চালক নেই। তবু চাকা ঘুরছিল, মাটি সরছিল, কাজ এগিয়ে যাচ্ছিল।

হলুদ নদীর তীরে সেদিন শুরু হয়েছিল পৃথিবীর অন্যতম অদ্ভুত নির্মাণ প্রকল্প—ইয়াংকু (Yangqu) বাঁধ।

যে জায়গায় এই প্রকল্প গড়ে উঠেছে, সেখানে একসময় দাঁড়িয়ে ছিল আতসোক গোন দেচেন চোয়েখোরলিং মঠ (Atsok Gon Dechen Choekhorling Monastery), উনিশ শতকে প্রতিষ্ঠিত একটি বৌদ্ধ মঠ। প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য আশপাশের গ্রাম থেকে কয়েক হাজার তিব্বতি বাসিন্দাকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। মঠটিও ভেঙে ফেলা হয়েছে।

ইয়াংকুর পানি আসে আক্ষরিক অর্থেই "পৃথিবীর ছাদ" থেকে। হলুদ নদী বা হোয়াংহো—চিনের দ্বিতীয় দীর্ঘতম নদী, যাকে চিনারা ডাকেন "মাদার রিভার" বলে—এর উৎস কিংহাই প্রদেশেরই উঁচু মালভূমিতে। তিব্বতিরা একে বলেন মাচু নদী। নদীর প্রায় ৪৫ শতাংশ পানি আসে তিব্বত মালভূমির হিমবাহ আর ভূগর্ভস্থ ঝরনা থেকে।

উৎস থেকে বেরিয়ে নদীটা যে অংশে ইয়াংকুর কাছে পৌঁছায়, সেটা খাড়া গিরিখাত আর পাহাড়ি উপত্যকার এক ধারাবাহিকতা—জল দ্রুত গতিতে নিচে নামছে, এবং এই গতি-শক্তিকেই বিদ্যুতে রূপান্তর করা সবচেয়ে সহজ। সেই কারণেই হলুদ নদীর প্রায় সব বড় জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র এই উপরের অংশেই। ইয়াংকু একা নয়—এর ওপরে-নিচে মিলিয়ে ক্যাসকেডের মত একের পর এক বাঁধ দাঁড়িয়েছে এবং পরিকল্পনায় আরও আছে।

একটা কাগজ থেকে যেভাবে শুরু

একটা বাঁধ আর একটা থ্রিডি প্রিন্টারের মধ্যে মিল কোথায়?

প্রথম শুনলে প্রশ্নটা অদ্ভুত মনে হতে পারে। কিন্তু ২০২২ সালের এপ্রিলে ছিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি পিয়ার-রিভিউড জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাপত্রে অধ্যাপক লিউ তিয়ানইউন ঠিক এই দাবিই করেছিলেন। গবেষণাপত্রটির শিরোনাম ছিল "থ্রিডি প্রিন্টিং অফ লার্জ ফিলড কনস্ট্রাকশন প্রজেক্টস" (3D Printing of Large Filled Construction Projects)।

একটি থ্রিডি প্রিন্টার যেমন একটার পর একটা স্তর জমিয়ে কোনো বস্তু তৈরি করে, বাঁধও তেমনই স্তরে স্তরে মাটি, পাথর ও নির্মাণসামগ্রী চাপিয়ে গড়ে ওঠে। এক অর্থে দুটিই "লেয়ার-বাই-লেয়ার" নির্মাণ পদ্ধতি।

তাহলে পার্থক্য কোথায়?

লিউয়ের উত্তর ছিল—কাজটা কে করছে, সেখানে। ছোট আকারের থ্রিডি প্রিন্টারে কাজ করে একটা যন্ত্র। আর বিশাল আকারের এই "প্রিন্টারে" কাজ করে ট্রাক, বুলডোজার, পেভার আর রোলারের সমন্বয়ে গঠিত একদল স্বয়ংক্রিয় মেশিন।

মেশিনগুলি আসলে কেমন

এখানে কাজ করা যন্ত্রগুলির কোনো হাত নেই, পা নেই, এমনকি দেখতে আলাদা কিছু বলেও মনে হয় না। এগুলি আসলে পরিচিত নির্মাণযন্ত্র—খননকারী যন্ত্র, ট্রাক, বুলডোজার, পেভার আর রোলার।

প্রতিটি যন্ত্রে বসানো হয়েছিল সেন্সর, উচ্চ-নির্ভুলতার অবস্থান নির্ণয় ব্যবস্থা, জিপিএস রিসিভার এবং একটি কেন্দ্রীয় কমান্ড সিস্টেমের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগের প্রযুক্তি।

তবে ইয়াংকু এই প্রযুক্তির প্রথম পরীক্ষা ছিল এমন না। তিব্বত মালভূমির কঠিন পরিবেশে ব্যবহারের আগে এই অটোনোমাস যন্ত্রগুলিকে চিনের মহাসড়কে পরীক্ষা করা হয়েছিল।

কাজটা যেভাবে হত

ইয়াংকু বাঁধ নির্মাণের পুরো প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে ছিল একটি ত্রিমাত্রিক ডিজিটাল মডেল। বাঁধের নকশাটাকে কেন্দ্রীয় এআই হাজার হাজার অনুভূমিক স্তরে ভাগ করে ফেলত। প্রতিটি স্তরে কতটুকু মাটি ও পাথর লাগবে, কোথায় লাগবে, কোন ক্রমে বসাতে হবে—সব হিসাব আগেভাগেই করে নেওয়া হত। তারপর সেই নির্দেশনা পৌঁছে যেত নির্মাণস্থলের যন্ত্রগুলির কাছে।

প্রথমে চালকবিহীন ট্রাক নির্দিষ্ট পরিমাণ নির্মাণসামগ্রী ঠিক জায়গায় পৌঁছে দিত। তারপর স্বয়ংক্রিয় বুলডোজার ও পেভার সেই সামগ্রী ছড়িয়ে একটি নতুন স্তর তৈরি করত। শেষ ধাপে সেন্সর-সজ্জিত রোলার স্তরটির ওপর দিয়ে বারবার চলাচল করে মাটি ও পাথরকে নির্ধারিত ঘনত্ব পর্যন্ত চাপ দিয়ে শক্ত করত।

কাজটা শুধু নির্দেশ মেনে চলার ছিল না। প্রতিটি রোলার চলন্ত অবস্থাতেই তথ্য সংগ্রহ করত। মাটির ঘনত্ব কত হয়েছে, কোথাও ফাঁক রয়ে গেছে কিনা, স্তরটি নির্ধারিত মানে পৌঁছেছে কিনা—এসব তথ্য রিয়েল টাইমে কেন্দ্রীয় সিস্টেমে পাঠানো হত। কোনো অংশে মান ঠিকমত অর্জিত না হলে সিস্টেম সঙ্গে সঙ্গে নতুন নির্দেশ পাঠাত।

এখানেই মানুষের সঙ্গে যন্ত্রের পার্থক্যটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

একজন দক্ষ চালকও সবসময় একই গতিতে, একই চাপ প্রয়োগ করে বা একদম নিখুঁত সরলরেখায় কাজ করতে পারে না। কিন্তু এআই-নিয়ন্ত্রিত সিস্টেমের কাছে প্রতিটি স্তর কেবল ডেটা আর নির্দেশনার বিষয়। অধ্যাপক লিউয়ের ভাষায়, পুরো প্রক্রিয়াটি চলতে পারে বিরতিহীনভাবে—দিন-রাত, সপ্তাহের পর সপ্তাহ—একই মান বজায় রেখে।

প্রযুক্তির আড়ালে বড় প্রশ্ন

"শূন্য মানব শ্রমিক"—ইয়াংকু বাঁধ নিয়ে ছড়িয়ে পড়া অনেক প্রতিবেদনের মূল আকর্ষণ ছিল এই দাবি। কিন্তু বাস্তবতা একটু ভিন্ন।

নির্মাণস্থলের ভেতরে শ্রমিক না থাকার বিষয়টি সত্যি। ট্রাক, বুলডোজার, পেভার ও রোলার নিজেরাই কাজ করেছে। কিন্তু পুরো প্রকল্প থেকে মানুষ অদৃশ্য হয়ে যায়নি। বাঁধের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল মানুষকেই সংগ্রহ করতে হয়েছে, আর দূরের একটি নিয়ন্ত্রণকক্ষে প্রকৌশলী ও অপারেটররা পুরো সিস্টেমের ওপর নজর রেখেছেন। অর্থাৎ প্রকল্পটি পুরোপুরি মানুষহীন ছিল না।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া মাকড়সার মত বিশাল রোবটের ছবিগুলির বেশিরভাগই বাস্তব নয়; সেগুলি এআই-নির্মিত কল্পচিত্র। বাস্তবতা অনেক কম নাটকীয়, কিন্তু প্রযুক্তিগতভাবে আরও বেশি অর্থবহ।

ইয়াংকুর মূল বাঁধ ১৫০ মিটার উঁচু, সঙ্গে রয়েছে ৪১ মিটার উঁচু একটি সহায়ক কংক্রিট গ্র্যাভিটি বাঁধ। পুরো জলবিদ্যুৎ কাঠামোর উচ্চতা প্রায় ১৮০ মিটার, যা মোটামুটি ৬০ তলা একটি ভবনের সমান।

প্রকল্পের মূল কাঠামোর কাজ শেষ হয় ২০২৪ সালের মে মাসে। সেই বছরের নভেম্বরে প্রথম ইউনিট গ্রিডে যুক্ত হয়ে বিদ্যুৎ পাঠানো শুরু করে এবং ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ পুরো বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি চালু হয়ে যায়। এখন প্রতি বছর প্রায় ৪৭৩ কোটি কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। সেই বিদ্যুৎ ১,৫০০ কিলোমিটার দূরের হেনান প্রদেশে পৌঁছাচ্ছে, যেখানে প্রায় ১০ কোটি মানুষের বসবাস।

অধ্যাপক লিউ এবং তার সহকর্মীদের মতে, এই প্রযুক্তির উদ্দেশ্য মানুষকে ভারি, পুনরাবৃত্তিমূলক ও বিপজ্জনক কাজ থেকে মুক্ত করা।

ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ভেতরের চেহারা

ইয়াংকু কোনো সাধারণ বাঁধ নয়। এটি একটি কনক্রিট-ফেস রক-ফিল ড্যাম বা CFRD। নামটা জটিল শোনালেও মূল ধারণাটা তুলনামূলক সহজ। বাঁধের ভেতরের অংশ তৈরি হয় স্তরে স্তরে চাপা পাথর ও মাটি দিয়ে, আর পানির দিকে থাকা মুখটা ঢেকে দেওয়া হয় একটি পুরু কংক্রিটের আবরণে।

এই কংক্রিটের স্তরই জলরোধী ঢাল হিসাবে কাজ করে, যাতে জলাধারের পানি বাঁধের ভেতরে ঢুকে না যায়। গত দুই দশকে চিন ১৫০টিরও বেশি CFRD নির্মাণ করেছে, ফলে এই প্রযুক্তিতে তারা এখন বিশ্বের অন্যতম অভিজ্ঞ দেশ।

বাঁধের ভেতরের জলাধারের ধারণক্ষমতা ১৬৪ কোটি ঘনমিটার পানি—সংখ্যাটা কাগজে পড়া সহজ, কল্পনা করা কঠিন। তুলনা করলে বলা যায়, ৪০০ বার হাতিরঝিল ভরাতে যে পানি, ইয়াংকু একাই তা ধরে রাখে।

কিন্তু ইয়াংকুর সবচেয়ে অভিনব অংশটি বাঁধের কংক্রিট বা টারবাইন নয়; সেটি হল এর ডিজিটাল মস্তিষ্ক।

কেন্দ্রীয় এআই পুরো বাঁধের ত্রিমাত্রিক নকশাকে একটি জীবন্ত ডিজিটাল মডেল হিসাবে ব্যবহার করেছে। নকশাটি হাজার হাজার অনুভূমিক স্তরে ভাগ করা হয়েছিল এবং প্রতিটি স্তরের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছিল পাথরের আকার, মাটির ধরন, আর্দ্রতার মাত্রা এবং কম্প্যাকশনের মান। একটি স্তরের কাজ শেষ হলে মাঠ থেকে আসা বাস্তব তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তী স্তরের পরিকল্পনাও সমন্বয় করা হত।

সবচেয়ে কঠিন কাজগুলির একটি ছিল বাঁধের পানি-নিরোধক কংক্রিট ফেস তৈরি করা। এখানে সামান্য ফাটলও বড় বিপদের কারণ হতে পারে। কারণ ১৬৪ কোটি ঘনমিটার পানির চাপ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষুদ্রতম দুর্বলতাকেও বড় সমস্যায় পরিণত করতে পারে। তাই বাঁধের প্রতিটি স্তরের ঘনত্ব, প্রতিটি পাথরের বিন্যাস এবং প্রতিটি রোলারের চাপ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।

ইয়াংকু একটি বিশাল পরীক্ষাগার। এখানে যে তথ্য সংগ্রহ হয়েছে, তা ভবিষ্যতের আরও উঁচু ও জটিল বাঁধ নির্মাণে ব্যবহার করা হবে। চিনের গবেষকরা ইতিমধ্যে ২৫০-৩০০ মিটার উঁচু CFRD তৈরির পথে এগোচ্ছেন, এবং ইয়াংকু সেই রোডম্যাপের একটা গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

বাঁধটি এখন শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে না, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি ডেটা-উৎস হিসাবেও কাজ করবে। আগামী কয়েক দশকে এর প্রতিটি স্তর কেমন আচরণ করছে, কোথায় চাপ বাড়ছে, কীভাবে কাঠামো বদলাচ্ছে—সবকিছুর রেকর্ড জমা হতে থাকবে।

অধ্যাপক লিউ এবং তার সহকর্মীরা নিজেদের গবেষণাপত্রেই লিখেছেন, একই পদ্ধতি রাস্তা, মহাসড়ক এবং অন্যান্য বৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণেও ব্যবহার করা যেতে পারে। ইতিমধ্যে XCMG ১২টি প্রদেশে ১৫টি মহাসড়ক প্রকল্পে, মোট প্রায় ৫০০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে স্বয়ংক্রিয় নির্মাণযন্ত্র ব্যবহার করেছে।

#বাঁধ #থ্রিডি #চিন

জন বার্ডিন: যে মানুষটি ডিজিটাল পৃথিবীর ভিত্তি গড়ে দিয়েছিলেনআজ আমরা পকেটের ভেতরে এমন একটি স্মার্টফোন নিয়ে ঘুরি, যেটি একসম...
26/05/2026

জন বার্ডিন: যে মানুষটি ডিজিটাল পৃথিবীর ভিত্তি গড়ে দিয়েছিলেন

আজ আমরা পকেটের ভেতরে এমন একটি স্মার্টফোন নিয়ে ঘুরি, যেটি একসময়কার বিশাল কম্পিউটারের চেয়েও শক্তিশালী। কিন্তু খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, যখন কম্পিউটার মানেই ছিল পুরো একটি ঘরজুড়ে থাকা দানবাকৃতির যন্ত্র।

বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ইলেকট্রনিক প্রযুক্তির ভিত্তি ছিল ভ্যাকুয়াম টিউব। এগুলি ছিল কাচের তৈরি বড় বড় নল, দেখতে কিছুটা বাল্বের মত। বিদ্যুতের প্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করার কাজ করত এগুলিই। রেডিও, রাডার, প্রাথমিক কম্পিউটার—সবকিছুই চলত ভ্যাকুয়াম টিউবের ওপর নির্ভর করে।

কিন্তু সমস্যা ছিল অসংখ্য। এগুলি খুব ভঙ্গুর ছিল, প্রচুর গরম হত, দ্রুত নষ্ট হয়ে যেত, আর বিদ্যুৎ খরচও ছিল বিপুল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তৈরি হওয়া বিশাল কম্পিউটারগুলির ভেতরে হাজার হাজার ভ্যাকুয়াম টিউব লাগত। একটি টিউব নষ্ট হলেই পুরো যন্ত্র থেমে যেত। তখনকার ইঞ্জিনিয়ারদের বড় একটা কাজ ছিল শুধু কোন টিউব পুড়ে গেছে সেটা খুঁজে বের করা।

বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারছিলেন, এভাবে চললে কম্পিউটার কোনোদিন সাধারণ মানুষের জীবনে পৌঁছাবে না। কম্পিউটার হয়ত সামরিক গবেষণাগার বা বড় প্রতিষ্ঠানের ভেতর সীমাবদ্ধ থাকবে, কিন্তু মানুষের ঘরে যাবে না। দরকার ছিল এমন কিছু, যা ছোট হবে, কম বিদ্যুতে চলবে, কম গরম হবে, আর সহজে নষ্ট হবে না।

এই সমস্যার সমাধান খুঁজতেই শুরু হয় ট্রানজিস্টরের গল্প।

মাঝামাঝি আচরণ করা এক অদ্ভুত পদার্থ

বিজ্ঞানীরা তখন বিদ্যুৎ পরিবাহিত হওয়ার ব্যাপারটি আরও গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা করছিলেন। কিছু পদার্থ খুব সহজে বিদ্যুৎ চালায়, যেমন তামা। আবার কিছু পদার্থ বিদ্যুৎ প্রায় আটকেই দেয়, যেমন রাবার বা কাঠ। কিন্তু কিছু পদার্থ ছিল মাঝামাঝি ধরনের। এগুলি পুরোপুরি বিদ্যুৎ পরিবাহীও নয়, আবার পুরোপুরি বাধাও নয়।

এই ধরনের পদার্থকে বলা হয় অর্ধপরিবাহী বা সেমিকন্ডাক্টর।

জার্মেনিয়াম ও পরে সিলিকন ছিল এমনই পদার্থ। বিজ্ঞানীরা ধীরে ধীরে বুঝতে পারলেন, এই “মাঝামাঝি” আচরণটাই আসলে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যদি কোনোভাবে বিদ্যুতের প্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তাহলে হয়ত বড় বড় ভ্যাকুয়াম টিউব ছাড়াই ছোট আকারে ইলেকট্রনিক যন্ত্র তৈরি করা সম্ভব হবে।

সেই সময় এটি ছিল অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ ধারণা। কারণ কম্পিউটারের মূল কাজই আসলে বিদ্যুতের প্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করা। কোথাও বিদ্যুৎ যাবে, কোথাও যাবে না—এই অন-অফের খেলাই পরে তৈরি করে ডিজিটাল ভাষা।

আজকের কম্পিউটার, স্মার্টফোন, ইন্টারনেট—সবশেষে সবকিছু দাঁড়িয়ে আছে ০ আর ১-এর ওপর। আর এই ০ ও ১ তৈরি করার সবচেয়ে মৌলিক যন্ত্র হল ট্রানজিস্টর।

নীরব স্বভাবের এক অসাধারণ মানুষ

জন বার্ডিন (John Bardeen) জন্মগ্রহণ করেন ১৯০৮ সালের ২৩ মে, যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন অঙ্গরাজ্যের ম্যাডিসন শহরে। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন অস্বাভাবিক মেধাবী। খুব কম কথা বলতেন, কিন্তু গণিত ও বিজ্ঞানের জগতে তার আগ্রহ ছিল গভীর।

তার বাবা ছিলেন ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিন মেডিক্যাল স্কুলের ডিন। কিন্তু কিশোর বয়সে মায়ের মৃত্যু বার্ডিনকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। এরপর তিনি আরও নীরব ও অন্তর্মুখী হয়ে ওঠেন। তবে এই নীরবতার আড়ালে তৈরি হচ্ছিল এক অসাধারণ বৈজ্ঞানিক মন।

প্রথমে তিনি ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েন। পরে কিছুদিন তেল শিল্পে কাজও করেন। ভূগর্ভে কোথায় তেল থাকতে পারে, সেটা বোঝার জন্য ভূকম্পনের তথ্য বিশ্লেষণ করতেন। কিন্তু তার আগ্রহ ছিল আরও গভীর প্রশ্নে—বিদ্যুৎ আসলে কী? ইলেকট্রন কীভাবে চলে? কঠিন পদার্থের ভেতরে কী ঘটে?

এই প্রশ্নগুলিই তাকে শেষ পর্যন্ত নিয়ে যায় পদার্থবিজ্ঞানের জগতে।

বেল ল্যাবস: যেখানে ভবিষ্যৎ তৈরি হচ্ছিল

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বার্ডিন যোগ দেন বেল ল্যাবস-এ। সেই সময় এটি ছিল পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাগার। টেলিফোন ব্যবস্থা থেকে শুরু করে ইলেকট্রনিক প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ—সবকিছু নিয়েই সেখানে গবেষণা চলত।

বেল ল্যাবসের বড় একটি লক্ষ্য ছিল ভ্যাকুয়াম টিউবের বিকল্প খুঁজে বের করা। কারণ বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারছিলেন, ছোট ও শক্তিশালী প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ তৈরি করতে হলে সম্পূর্ণ নতুন ধরনের যন্ত্র দরকার।

বার্ডিনের সঙ্গে কাজ করছিলেন ওয়াল্টার ব্র্যাটেইন ও উইলিয়াম শকলি। তিনজনই অসাধারণ মেধাবী ছিলেন, তবে তাদের স্বভাব ছিল একেবারেই ভিন্ন। শকলি ছিলেন উচ্চাভিলাষী ও নিয়ন্ত্রণপ্রবণ। অন্যদিকে বার্ডিন ছিলেন শান্ত, বিশ্লেষণধর্মী ও গভীর চিন্তার মানুষ।

তখন বিজ্ঞানীরা একটি বড় সমস্যায় আটকে ছিলেন। তারা জানতেন সেমিকন্ডাক্টর দিয়ে বিদ্যুতের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতে পারে, কিন্তু বাস্তবে সেটি কাজ করানো যাচ্ছিল না। কোনো না কোনোভাবে ইলেকট্রন আটকে যাচ্ছিল।

এখানেই বার্ডিনের গুরুত্বপূর্ণ অবদান আসে। তিনি বুঝতে পারলেন, সেমিকন্ডাক্টরের পৃষ্ঠে কিছু বিশেষ ইলেকট্রনিক অবস্থা তৈরি হচ্ছে, যেগুলি বিদ্যুতের স্বাভাবিক প্রবাহকে বাধা দিচ্ছে। সমস্যাটি বুঝতে পারার পর পরীক্ষাগুলি সফল হতে শুরু করে।

অবশেষে ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বর মাসে আসে সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত। একটি ছোট্ট জার্মেনিয়ামের টুকরার ওপর সোনার দুটি সূক্ষ্ম বিন্দু বসিয়ে তারা এমন একটি যন্ত্র তৈরি করলেন, যা বিদ্যুতের সংকেতকে নিয়ন্ত্রণ ও বৃদ্ধি করতে পারে।

এটাই ছিল প্রথম কার্যকর ট্রানজিস্টর।

ট্রানজিস্টর আসলে কী করে?

ট্রানজিস্টরকে সবচেয়ে সহজভাবে বলা যায় ক্ষুদ্র বৈদ্যুতিক সুইচ। এটি ঠিক করে কখন বিদ্যুৎ যাবে, আর কখন যাবে না।

আধুনিক কম্পিউটারের ভেতরে এমন কোটি কোটি ট্রানজিস্টর একসঙ্গে কাজ করে।

একটি ট্রানজিস্টর হয় অন, নয় অফ। অন মানে ১, অফ মানে ০। এই ০ আর ১ দিয়েই তৈরি হয় ডিজিটাল ভাষা। আপনার ফোনের ছবি, গান, ভিডিও, মেসেজ, এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উত্তরও শেষ পর্যন্ত রূপ নেয় অসংখ্য ০ ও ১-এ।

অর্থাৎ ট্রানজিস্টর শুধু একটি যন্ত্র নয়। এটি আধুনিক ডিজিটাল সভ্যতার মৌলিক ভিত্তি।

পৃথিবী ছোট হতে শুরু করল

ট্রানজিস্টর আবিষ্কারের পর প্রযুক্তির জগতে দ্রুত পরিবর্তন শুরু হয়। যন্ত্র ছোট হতে থাকে। আগে যে কাজ করতে পুরো একটি ঘর লাগত, ধীরে ধীরে সেটি ডেস্কে চলে আসে।

ট্রানজিস্টর ছোট হওয়ায় কম্পিউটারও ছোট হল। কম বিদ্যুৎ লাগল। এরপর এল ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট, তারপর মাইক্রোপ্রসেসর, তারপর ব্যক্তিগত কম্পিউটার, ইন্টারনেট, স্মার্টফোন।

আজ একটি আধুনিক প্রসেসরের ভেতরে কয়েক হাজার কোটি ট্রানজিস্টর থাকে। একটি ট্রানজিস্টরের আকার মাত্র কয়েক ন্যানোমিটার—এক মিটারের একশো কোটি ভাগের কয়েক ভাগ মাত্র। মানুষের চুলের চেয়েও হাজার হাজার গুণ চিকন।

কিন্তু এই বিশাল প্রযুক্তিগত যাত্রার শুরু হয়েছিল সেই ছোট্ট জার্মেনিয়ামের টুকরা থেকে।

ট্রানজিস্টর থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

আজ পৃথিবীর বিশাল ডেটা সেন্টারগুলি প্রতি সেকেন্ডে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন গণনা করছে। প্রতিটি চিপের গভীরে আছে কোটি কোটি ট্রানজিস্টর।

আপনার ফোনে ছবি তোলা, ভিডিও দেখা, অনলাইন ব্যাংকিং করা, জিপিএস ব্যবহার করা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম চালানো—সবকিছুর পেছনেই কাজ করছে এই ক্ষুদ্র বৈদ্যুতিক সুইচ।

আরেকটি রহস্য: সুপারকন্ডাক্টিভিটি

অনেক বিজ্ঞানীর জীবন একটিমাত্র আবিষ্কারে বিখ্যাত হয়ে যায়। কিন্তু জন বার্ডিন দু’বার পৃথিবী বদলে দিয়েছিলেন।

১৯১১ সালে বিজ্ঞানীরা দেখেছিলেন, কিছু পদার্থকে অত্যন্ত কম তাপমাত্রায় ঠাণ্ডা করলে সেগুলি হঠাৎ এমন আচরণ শুরু করে যেন বিদ্যুতের কোনো বাধাই নেই। সাধারণ অবস্থায় বিদ্যুৎ চলার সময় শক্তির কিছু অংশ তাপে নষ্ট হয়। বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বাড়িতে বিদ্যুৎ পৌঁছানোর পথেও শক্তির অপচয় ঘটে।

কিন্তু সুপারকন্ডাক্টরে সেই অপচয় প্রায় শূন্য। প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে এটি ছিল পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় রহস্যগুলির একটি।

ইলেকট্রনের অদ্ভুত সমন্বয়

বার্ডিন এই সমস্যার সমাধানে কাজ শুরু করেন লিওন কুপার ও জন রবার্ট শ্রিফারের সঙ্গে। বহু বছরের গবেষণার পর তারা ১৯৫৭ সালে তৈরি করেন বিসিএস তত্ত্ব।

সাধারণ অবস্থায় ইলেকট্রন একে অপরকে ধাক্কা দেয়, ফলে বাধা তৈরি হয়। কিন্তু খুব ঠাণ্ডা অবস্থায় তারা এমনভাবে সমন্বিত হয়ে চলে যে পদার্থের ভেতরে প্রায় কোনো বাধা তৈরি হয় না। ফলে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হতে পারে শক্তি না হারিয়েই।

আজও পৃথিবী তার আবিষ্কারের ওপর দাঁড়িয়ে আছে

সুপারকন্ডাক্টিভিটি গবেষণার অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক সম্মান ‘জন বার্ডিন প্রাইজ’ তার নামেই দেওয়া হয়।

১৯৯১ সালে তার মৃত্যু হলেও পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ প্রতিদিন তার আবিষ্কারের সুবিধা ব্যবহার করছে—হয়ত না জেনেই। আপনি যখন ফোন আনলক করেন, ভিডিও দেখেন বা এআই ব্যবহার করেন, তখনও কোথাও না কোথাও কাজ করছে জন বার্ডিনের সেই ছোট্ট বৈদ্যুতিক সুইচ।

#ট্রানজিস্টর #জনবার্ডিন #ডিজিটাল

কোটেশন: স্যাম অল্টম্যান #মানুষ  #বুদ্ধিমত্তা  #কেনা
22/05/2026

কোটেশন: স্যাম অল্টম্যান

#মানুষ #বুদ্ধিমত্তা #কেনা

ইজেকশন সিট: দুর্ঘটনার মুহূর্তে পাইলটের জীবনরক্ষাকারী আসন আধুনিক যুদ্ধবিমানগুলির ককপিটের ভেতরে এমন একটি প্রযুক্তি লুকিয়ে...
21/05/2026

ইজেকশন সিট: দুর্ঘটনার মুহূর্তে পাইলটের জীবনরক্ষাকারী আসন

আধুনিক যুদ্ধবিমানগুলির ককপিটের ভেতরে এমন একটি প্রযুক্তি লুকিয়ে থাকে, যা নিশ্চিত ধ্বংসের হাত থেকে শেষ মুহূর্তে পাইলটের জীবন রক্ষা করতে পারে। এর নাম ‘ইজেকশন সিট’।

কোনো বিমান যদি নিয়ন্ত্রণ হারায়, আগুন ধরে যায়, কিংবা আকাশেই ভেঙে পড়ার অবস্থায় পড়ে, তখন পাইলটের হাতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য মাত্র কয়েক সেকেন্ড সময় থাকে। সেই মুহূর্তে ককপিট খুলে লাফ দেওয়া প্রায় অসম্ভব। কারণ বিমানের গতি, বাতাসের চাপ এবং মাধ্যাকর্ষণ জনিত বল চালককে কার্যত আসনের সঙ্গে চেপে ধরে।

এই জটিল পরিস্থিতিতেই ইজেকশন সিট কাজ করে। শক্তিশালী বিস্ফোরক, স্প্রিং বা ধাক্কা দেওয়ার বিশেষ ব্যবস্থা (ক্যাটাপল্ট) এবং রকেট মোটরের সাহায্যে পুরো সিটটিকে পাইলটসহ বিমান থেকে এক ঝটকায় বাইরে ছুড়ে দেওয়া হয়। আর প্যারসুট ধাপে ধাপে নিজে থেকেই খুলে যায়।

আকাশে বেচে থাকার প্রথম লড়াই

বিমানের শুরুর যুগে জরুরি অবস্থায় বাঁচার একমাত্র উপায় ছিল “বেইল আউট”, অর্থাৎ ককপিট থেকে নিজে লাফ দেওয়া। কিন্তু বিমানের গতি বাড়তে থাকলে এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। প্রচণ্ড বাতাস পাইলটকে ককপিটের ভেতরেই আটকে ফেলত, আর কেউ কেউ বের হলেও অনেক সময় বিমানের ডানা বা লেজে ধাক্কা খেত।

এই সমস্যার সমাধান খোঁজা শুরু হয় ১৯১০ সালের দিকেই। ১৯১৬ সালে ব্রিটিশ উদ্ভাবকএভারার্ড ক্যালথ্রপ কমপ্রেসড এয়ারচালিত একটি ইজেকশন সিটের পেটেন্ট নেন, যদিও সেটি বাস্তবে ব্যবহার করা হয়নি।

১৯২০-এর দশকে রোমানীয় উদ্ভাবক আনাস্তাসে দ্রাগোমির এবং তার সহযোগী তানাসে দব্রেস্কু আধুনিক ইজেকশন সিটের মত একটি নকশা তৈরি করেন।

তাদের ডিজাইনে ক্যাটাপল্টের সাহায্যে পুরো ককপিটই পাইলটসহ বিমান থেকে ছিটকে বের হয়ে আসত। ১৯২৯ সালে প্যারিসের অরলি বিমানবন্দরে এর সফল পরীক্ষাও করা হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় প্রযুক্তিটি সত্যিকারের প্রয়োজন হয়ে দাঁড়ায়। যুদ্ধবিমান, বিশেষ করে জার্মান জেট বিমানগুলির গতি এত বেড়ে গিয়েছিল যে জরুরি অবস্থায় পাইলটের পক্ষে ককপিট থেকে বের হওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

এই কঠিন পরিস্থিতি থেকেই তৈরি হল ইতিহাসের প্রথম কার্যকর ইজেকশন সিট। এটি বসানো হয়েছিল জার্মানির 'হাইনকেল হি-২৮০' জেট বিমানে।

১৯৪২ সালের ১৩ জানুয়ারি এই বিমানের টেস্ট পাইলট হেলমুট শেঙ্ক ইতিহাসের প্রথম সফল জরুরি ইজেকশন সম্পন্ন করেন। এরপর যুদ্ধের শেষ দিকে 'হি-১৬২' বিমানের মাধ্যমে আরও উন্নত ও বিস্ফোরক-চালিত সিস্টেমের ব্যবহার শুরু হয়। এখান থেকেই আধুনিক ইজেকশন সিটের যুগ শুরু।

মার্টিন-বেকার এবং দুই-ধাপের বিপ্লব

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুদ্ধবিমান শব্দের চেয়েও বেশি গতিতে উড়তে শুরু করলে পুরোনো ইজেকশন ব্যবস্থা আর কার্যকর থাকল না। তখন ব্রিটিশ কোম্পানি Martin-Baker নতুন ধরনের ইজেকশন সিস্টেম তৈরি করে।

১৯৪৬ সালে তাদের সিস্টেম প্রথম সফল ফ্লাইট টেস্ট পাস করে, যখন প্রকৌশলী বার্নার্ড লিঞ্চ একটি Gloster Meteor বিমান থেকে নিরাপদে ইজেক্ট করেন।

প্রথম দিকের ইজেকশন সিটে “গান ক্যাটাপল্ট” ব্যবহার করা হত। বিস্ফোরণের ধাক্কায় সিট ওপরে ছিটকে উঠত। কিন্তু বেশি শক্তি হলে পাইলটের মেরুদণ্ডে আঘাত লাগত, আর কম শক্তি হলে তিনি বিমানের লেজে ধাক্কা খেতে পারতেন।

পরে আসে দুই-ধাপের ব্যবস্থা। প্রথমে ক্যাটাপল্ট সিটকে ককপিটের বাইরে ঠেলে দেয়, তারপর রকেট মোটর সেটিকে আরও ওপরে ও দূরে নিয়ে যায়। এতে ইজেকশন অনেক বেশি নিরাপদ হয়ে ওঠে।

ভেতরের ঘটনা

আধুনিক ইজেকশন সিটে একটি টাইমিং কম্পিউটার বা “সিকোয়েন্সার” থাকে, যা পুরো প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে নিয়ন্ত্রণ করে। পাইলট ইজেকশন হ্যান্ডেল টানার সঙ্গে সঙ্গেই ককপিটের কাচ (ক্যানোপি) উড়ে যায় বা ভেঙে যায়। এরপর গান ক্যাটাপল্ট সিটটিকে ওপরে ঠেলে দেয়, আর কয়েক মিলিসেকেন্ডের মধ্যেই চালু হয় রকেট মোটর।

সিটটিকে বাতাসে স্থির রাখতে প্রথমে একটি ছোট প্যারাসুট (drogue chute) বের হয়, যাতে এটি ঘুরতে না থাকে। নির্দিষ্ট উচ্চতায় পৌঁছানোর পর পাইলট ও সিট আলাদা হয়ে যায় (ম্যান-সিট সেপারেশন), তারপর খোলে মূল প্যারাসুট। পুরো ঘটনাটি ঘটে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে।

প্রথম দিকের ইজেকশন সিটের একটি বড় সমস্যা ছিল—এগুলি কাজ করার জন্য নির্দিষ্ট উচ্চতা ও গতি দরকার হত। খুব নিচু থেকে ইজেক্ট করলে প্যারাসুট খোলার সময়ই পাওয়া যেত না। পরে “জিরো-জিরো” প্রযুক্তি এই সীমাবদ্ধতা দূর করে। এর ফলে শূন্য উচ্চতা ও শূন্য গতিতেও পাইলটকে বাঁচানো সম্ভব হয়।

আধুনিক সিটের শক্তিশালী রকেট প্যাক বিমান রানওয়েতে দাঁড়িয়ে থাকলেও পাইলটকে যথেষ্ট ওপরে তুলে দিতে পারে, যাতে নিরাপদে প্যারাসুট খুলতে পারে।

তবে সব পরিস্থিতিতে ইজেকশন সমান নিরাপদ নয়। বিমান চালনায় “সেফ এনভেলপ” নামে একটি ধারণা আছে, অর্থাৎ কোন গতি, উচ্চতা ও অবস্থানে ইজেক্ট করলে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।

বিমান যদি দ্রুত পাক খেতে খেতে নিচে নামতে থাকে (স্পিন) বা খুব কম উচ্চতায় থাকে, তাহলে ইজেকশন প্রাণঘাতী হতে পারে। আবার বিমান অত্যন্ত দ্রুত ঘুরলে (উচ্চ রোল রেট) প্যারাসুটের দড়ি জড়িয়ে যেতে পারে এবং পাইলট গুরুতর আঘাত পেতে পারেন।

মানবদেহের ওপর নির্মম চাপ

ইজেকশন সিট পাইলটের জীবন বাঁচালেও মানবদেহের ওপর এটি প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে। ইজেকশনের সময় কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পাইলটের শরীরে ১২-১৪ জি পর্যন্ত চাপ পড়তে পারে, অর্থাৎ তখন শরীরের ওজন স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ১৪ গুণ বেশি অনুভূত হয়।

কিছু পুরোনো সোভিয়েত সিস্টেমে এই চাপ ২০ জিরও বেশি ছিল। এর ফলে মেরুদণ্ডে আঘাত, কশেরুকা ফেটে যাওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি পিঠের সমস্যাও দেখা গেছে।

এর সঙ্গে থাকে “এয়ার ব্লাস্ট” বা বাতাসের ভয়ংকর ধাক্কা। শব্দের গতির চেয়েও বেশি গতিতে ইজেক্ট করলে বাতাস প্রায় শক্ত দেয়ালের মত আঘাত করে, আর গতি বাড়ার সঙ্গে ঝুঁকিও বাড়ে।

এই তীব্র চাপে পাইলটের হাত-পা ছিটকে যাওয়া, হেলমেট ভেঙে যাওয়া বা ত্বক ছিঁড়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। তাই আধুনিক ইজেকশন সিটে “লিম্ব রেস্ট্রেইন্ট সিস্টেম” ব্যবহার করা হয়, যা ইজেকশনের সময় পাইলটের হাত ও পা শক্তভাবে শরীরের সঙ্গে ধরে রাখে।

বিশ্বের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ইজেকশন সিস্টেমগুলি

আধুনিক ইজেকশন সিটের জগতে সবচেয়ে পরিচিত দুটি নাম হল আমেরিকার ACES II এবং রাশিয়ার K-36DM। পশ্চিমা বিশ্বের বহু জনপ্রিয় যুদ্ধবিমান—যেমন F-15, F-16 ও B-1B বোমারু বিমানে ব্যবহৃত হয়েছে ACES II সিট। এটি নির্ভরযোগ্যতা ও দ্রুত কাজ করার ক্ষমতার জন্য বিশেষভাবে পরিচিত।

অন্যদিকে, রুশ K-36DM সিটটি চরম প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও পাইলটকে বাঁচিয়ে রাখার ক্ষমতার জন্য বিখ্যাত। প্রচণ্ড গতি ও বাতাসের তীব্র ধাক্কার মধ্যেও এটি কাজ করে। এর একটি বিশেষ ব্যবস্থা হল “উইন্ড ব্লাস্ট ডিফ্লেক্টর”, যা ইজেকশনের সময় পাইলটের মুখ ও বুককে বাতাসের মারাত্মক আঘাত থেকে রক্ষা করে।

দুই সিটের যুদ্ধবিমান বা ট্রেইনার বিমানে আবার থাকে “কমান্ড ইজেকশন” ব্যবস্থা। এতে একজন পাইলট ইজেক্ট করলেই অন্যজনও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বের হয়ে যান, যাতে বিপদের মুহূর্তে সময় নষ্ট না হয়।

হেলিকপ্টারে ইজেকশন সিট ব্যবহার অসম্ভব বলেই দীর্ঘদিন মনে করা হত, কারণ মাথার ওপর ঘুরতে থাকে রোটর ব্লেড। কিন্তু রাশিয়ার Kamov Ka-50 ও Ka-52 যুদ্ধহেলিকপ্টারে সেই সমস্যার সমাধান করা হয়েছে। Zvezda কোম্পানির K-37 সিস্টেমে ইজেকশনের ঠিক আগে বিস্ফোরক বোল্ট দিয়ে রোটর ব্লেড উড়িয়ে ফেলা হয়, তারপর পাইলটকে ওপরে ছিটকে বের করে আনা হয়।

ভবিষ্যৎ এবং বেঁচে ফেরাদের ক্লাব

আধুনিক ইজেকশন সিট এখন শুধু যান্ত্রিক যন্ত্র নয়, ধীরে ধীরে এটি কম্পিউটার-নির্ভর স্মার্ট সিস্টেমে পরিণত হচ্ছে। F-35-এর মত আধুনিক বিমানে “অটো-ইজেকশন” নিয়েও কাজ চলছে, যাতে পাইলট অজ্ঞান হলেও সিস্টেম নিজেই জীবনরক্ষার সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

মার্টিন-বেকার কোম্পানির একটি বিশেষ ক্লাব আছে, “Ejection Tie Club”। সদস্য হতে পারেন শুধু তারাই, যারা তাদের ইজেকশন সিট ব্যবহার করে প্রাণে বেঁচে ফিরেছেন। কোম্পানির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত তাদের সিট ৭,৮০০-এর বেশি মানুষের জীবন বাঁচিয়েছে।

#বিমান #পাইলট #ইজেকশন_সিট

প্রতিদিনের ২৪টি স্মার্ট অভ্যাসস্মার্ট হওয়া মানে নিজেকে বেশি বুদ্ধিমান দেখানো নয়। এর মানে হল—ভালভাবে চিন্তা করতে পারা, দ্...
20/05/2026

প্রতিদিনের ২৪টি স্মার্ট অভ্যাস

স্মার্ট হওয়া মানে নিজেকে বেশি বুদ্ধিমান দেখানো নয়। এর মানে হল—ভালভাবে চিন্তা করতে পারা, দ্রুত শেখা, সময়কে সঠিকভাবে কাজে লাগানো। অনেকেই ভাবেন স্মার্ট মানুষ জন্মগতভাবেই আলাদা। কিন্তু বাস্তবে মানুষকে এগিয়ে দেয় তার প্রতিদিনের ছোট ছোট অভ্যাসগুলিই।

সব অভ্যাস একসঙ্গে শুরু করার প্রয়োজন নেই। ছোট করে শুরু করুন, কিন্তু নিয়মিত চালিয়ে যান। কারণ প্রতিদিনের ছোট উন্নতিই একসময় বড় পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করে।

প্রকৃতি কেন পুনরাবৃত্তি পছন্দ করে না মানুষের মস্তিষ্ক প্যাটার্ন খুঁজতে ভালোবাসে। কোথাও একই ঘটনা বারবার ঘটলে আমরা দ্রুত স...
20/05/2026

প্রকৃতি কেন পুনরাবৃত্তি পছন্দ করে না

মানুষের মস্তিষ্ক প্যাটার্ন খুঁজতে ভালোবাসে। কোথাও একই ঘটনা বারবার ঘটলে আমরা দ্রুত সেটাকে "নিয়ম" বা "শৃঙ্খলা" বলে চিনে ফেলি। সূর্য ওঠে রোজ, ঋতু বদলায়, হৃদপিণ্ড স্পন্দিত হয়, ঢেউ আসে আর যায়। এই পুনরাবৃত্তিগুলি মনে স্থিরতা তৈরি করে। মনে হয় মহাবিশ্ব একটা ছন্দ মেনে চলছে।

এ কারণেই বিজ্ঞান ও দর্শনে অনেক দিন একটা ধারণা বদ্ধমূল হয়ে ছিল: শৃঙ্খলা মানেই পুনরাবৃত্তি।

একটা ইটের দেয়াল, টাইলসের মেঝে কিংবা স্ফটিকের ভেতরের পরমাণু সবখানেই একই গঠন বারবার ফিরে আসে। যেন প্রকৃতি নিজেই কপি-পেস্ট করতে ভালবাসে।

কিন্তু বিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে এসে বিজ্ঞানীরা দেখলেন, শৃঙ্খলা সবসময় পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে প্রকাশ পায় না। এমন গঠনও আছে যেখানে গভীর নিয়ম আছে, অথচ সেই নিয়ম কখনও হুবহু একইভাবে ফিরে আসে না।

এটা শুধু গণিত বা পদার্থবিজ্ঞানের আবিষ্কার নয়। মানুষের চিন্তার ইতিহাসেও এটা একটা দার্শনিক ধাক্কা।

প্রকৃতির ভাষা: পুনরাবৃত্তি নয়, সম্পর্ক

একটা বন কখনও পুরোপুরি সমান নয়। প্রতিটি গাছ আলাদা, প্রতিটা পাতার শিরা আলাদা, মাটির আর্দ্রতাও জায়গায় জায়গায় বদলায়। তবু বনকে বিশৃঙ্খল মনে হয় না।

কারণ সেখানে সম্পর্ক আছে।

একই ব্যাপার দেখা যায় নদীর শাখা-প্রশাখায়, মেঘের আকারে, ফুসফুসের ভেতরের বায়ুনালিতে। কোথাও হুবহু পুনরাবৃত্তি নেই। তবু একটা গাণিতিক বা জৈবিক সংগতি কাজ করছে।

মানে, কোনো কাঠামো কখনও হুবহু পুনরাবৃত্ত না হয়েও গভীরভাবে সংগঠিত হতে পারে।

প্রকৃতি প্রায়ই কপি-পেস্ট করে না। সে একটা মৌলিক নিয়মকে বারবার নতুন করে প্রকাশ করে। অনেক বিজ্ঞানী এটাকে বলেন self-similarity বা স্ব-সাদৃশ্য।

এর বিখ্যাত উদাহরণ ফ্র্যাক্টাল (Fractal)। ফ্র্যাক্টাল হল এমন এক ধরনের জ্যামিতিক গঠন, যেখানে ছোট অংশের ভেতরেও পুরো কাঠামোর ছাপ দেখা যায়। আপনি যত জুম করবেন, ততই মনে হবে বড় আকৃতিটারই ছোট সংস্করণ দেখছেন।

তবে এগুলি কখনও পুরোপুরি এক নয়—প্রতিবারই সামান্য পরিবর্তন থাকে। প্রকৃতির অনেক গঠনে এই বৈশিষ্ট্য দেখা যায়—বজ্রপাত, তুষারকণা, উপকূলরেখা। তবে সবচেয়ে দৃশ্যমান উদাহরণ রোমানেস্কো ব্রকোলি। এই সবজির পৃষ্ঠে সর্পিলের পর সর্পিল সাজানো, প্রতিটি ছোট সর্পিল নিজেই পুরো কাঠামোর প্রতিচ্ছবি।

ফিবোনাচ্চি: পুনরাবৃত্তিহীন ছন্দ

এই ধারণার সবচেয়ে চেনা উদাহরণ ফিবোনাচ্চি ধারা।

১, ১, ২, ৩, ৫, ৮, ১৩, ২১, ৩৪ …

এখানে প্রতিটা সংখ্যা আগের দুটির যোগফল। দেখতে খুব সাধারণ নিয়ম। অথচ প্রকৃতির অসংখ্য জায়গায় এটা ফিরে ফিরে আসে।

সূর্যমুখীর বীজ এমনভাবে সাজানো থাকে যেন কম জায়গায় বেশি বীজ ধরে। গাছের পাতাও অনেক সময় এমন কোণে জন্মায় যাতে প্রতিটা পাতা সর্বোচ্চ আলো পায়। এই দক্ষ বিন্যাসের ভেতরেই ফিবোনাচ্চির অনুপাত লুকিয়ে থাকে। শামুকের খোলসেও একই অনুপাত ফিরে আসে।

মজার ব্যাপার, এখানে পুনরাবৃত্তি নেই। ১, ১, ২, ৩, ৫, ৮, ১৩ সংখ্যাগুলি একইভাবে ঘুরে আসে না। তবু একটা গভীর সম্পর্ক পুরো ধারাটাকে বেঁধে রাখে।

মানে, শৃঙ্খলা এখানে "একই হওয়া" থেকে আসছে না। আসছে "সম্পর্কিত হওয়া" থেকে।

ইসলামি স্থাপত্যের ভুলে যাওয়া অধ্যায়

পুনরাবৃত্তিহীন প্যাটার্নের ধারণা পশ্চিমা গণিতে এসেছে ১৯৭০-এর দশকে, যখন রজার পেনরোজ তার বিখ্যাত টাইলিং নকশা তৈরি করেন। তবে কাছাকাছি ধরনের জ্যামিতিক চিন্তার ছাপ পাওয়া যায় মধ্যযুগীয় ইসলামি স্থাপত্যেও।

ইরানের ইসপাহান, উজবেকিস্তানের সমরকন্দ, বুখারা—এসব শহরের মসজিদ আর মাদ্রাসার দেয়ালে যে জ্যামিতিক নকশা আছে, তার নাম "গিরিহ" টাইলিং। বেশিরভাগ গিরিহ আসলে পর্যাবৃত্ত, অর্থাৎ একই গঠন বারবার ফিরে আসে।

কিন্তু ২০০৭ সালে পিটার লু ও পল স্টাইনহার্ট নামের দুই পদার্থবিজ্ঞানী একটা গবেষণায় দেখান, ইসপাহানের দারব-ই ইমাম মাজারের (১৪৫৩) নকশায় পেনরোজ টাইলিং-এর কাছাকাছি বৈশিষ্ট্য আছে।

পেনরোজ টাইলিং ও কোয়াসিক্রিস্টাল: তত্ত্ব মিলল বাস্তবে

একটা তাত্ত্বিক সমস্যা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে পেনরোজ এমন এক জ্যামিতিক নকশা তৈরি করেন, যা পরে গণিত ও স্ফটিকবিজ্ঞানের প্রচলিত ধারণাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।

শুরুতে এটা ছিল নিছক একটা বিমূর্ত গাণিতিক ধারণা—কয়েক ধরনের নির্দিষ্ট আকারের টাইল দিয়ে পুরো সমতল ভরাট করার পদ্ধতি। আশ্চর্যের বিষয়, নকশায় স্পষ্ট শৃঙ্খলা থাকলেও সেটা কখনও পুরোপুরি পুনরাবৃত্ত হয় না।

এক দশক পরে এই বিমূর্ত ধারণা হঠাৎ বাস্তব রূপ পেল। ১৯৮২ সালে ইসরায়েলি বিজ্ঞানী ড্যান শেচ্টম্যান একটা ধাতব মিশ্রণ পরীক্ষা করতে গিয়ে এমন এক পরমাণু-গঠন দেখতে পান, যেটা ঠিক প্রচলিত ক্রিস্টালের মত নয়।

সাধারণ ক্রিস্টালে পরমাণু এমনভাবে সাজানো থাকে যে একই গঠন বারবার ফিরে আসে। তার গঠনে শৃঙ্খলা ছিল, নির্দিষ্ট কোণ ছিল, কিন্তু একই গঠন বারবার ফিরে আসত না।

বিজ্ঞানীরা বুঝলেন, পেনরোজের পুনরাবৃত্তিহীন নকশা এই নতুন পদার্থের জন্য গাণিতিক মডেল হিসাবে কাজ করতে পারে।

সঙ্গীত ও ভাষা: নিয়মের ভেতরে স্বাধীনতা

এই ধারণা শুধু গণিত বা পদার্থবিজ্ঞানে আটকে নেই। একটা মহান সিম্ফনিতে কিছু থিম বারবার ফিরে আসে, কিন্তু হুবহু একইভাবে নয়। প্রতিবার সামান্য বদলায়, নতুন যন্ত্র যোগ হয়, গতি পাল্টায়। সবকিছু পুরোপুরি পুনরাবৃত্ত হলে সঙ্গীত যান্ত্রিক হয়ে যেত।

মানুষের ভাষাও একই রকম। আমরা প্রতিদিন নতুন বাক্য তৈরি করি, যা আগে কেউ বলেনি। ভাষা পুরোপুরি পুনরাবৃত্তিমূলক হলে সাহিত্য তৈরি যেমন অসম্ভব হত, আবার কোনো নিয়ম না থাকলে কোনো যোগাযোগই অসম্ভব হয়ে যেত।

একই বৈশিষ্ট্য আমাদের শরীরের ভেতরেও। সুস্থ মস্তিষ্কের তরঙ্গ পুরোপুরি নিয়মিত হয় না—হলেও বিপদ। মৃগী রোগের কিছু ধরনের খিঁচুনিতে মস্তিষ্কের একটা অংশ হঠাৎ অতিরিক্ত নিয়মিত, পুনরাবৃত্ত বিদ্যুৎ ছাড়তে শুরু করে।

আবার পুরোপুরি এলোমেলো হলে সেটা কোমার দিকে চলে যায়। সুস্থ মস্তিষ্ক ঠিক মাঝখানে—এমন এক জটিল ছন্দে, যেটা পুরোপুরি নিয়মিতও নয়, পুরোপুরি বিশৃঙ্খলও নয়।

কোয়ান্টাম কম্পিউটার: সময়ের ভেতর ছন্দ

সম্প্রতি কোয়ান্টাম কম্পিউটার নিয়ে একটা গবেষণা এই ধারণাকে নতুনভাবে সামনে এনেছে। কোয়ান্টাম কম্পিউটারের কিউবিট খুব দ্রুত অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। তাপ, কম্পন, এমনকি ক্ষুদ্র বৈদ্যুতিক ব্যাঘাতও তাদের সূক্ষ্ম কোয়ান্টাম অবস্থা নষ্ট করে দিতে পারে। বিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরে চেষ্টা করছেন, কীভাবে এই ভঙ্গুর সিস্টেমকে আরেকটু বেশি সময় স্থিতিশীল রাখা যায়।

২০২২ সালে ফিলিপ দুমিত্রেস্কুর নেতৃত্বে একদল পদার্থবিজ্ঞানী Nature জার্নালে একটি গবেষণা প্রকাশ করেন। তারা কোয়ান্টিনুয়াম কোম্পানির কোয়ান্টাম কম্পিউটারে দশটি ইটারবিয়াম পরমাণুর ওপর দু'ভাবে লেজার পালস ছোঁড়েন। একবার সম্পূর্ণ নিয়মিত ছন্দে, আরেকবার ফিবোনাচ্চি ধারার ভিত্তিতে এক ধরনের পুনরাবৃত্তিহীন প্যাটার্নে।

নিয়মিত পালসে কিউবিট মাত্র ১.৫ সেকেন্ড পর্যন্ত স্থিতিশীল ছিল, কিন্তু ফিবোনাচ্চি-ভিত্তিক পালসে সেই সময় বেড়ে দাঁড়ায় ৫.৫ সেকেন্ডে। কারণ পুনরাবৃত্তিহীন এই বিন্যাস কিউবিটকে একটা বাড়তি প্রতিসাম্য দেয়, যা বাহ্যিক ব্যাঘাত থেকে কোয়ান্টাম অবস্থাকে কিছুটা বেশি সুরক্ষা দিতে পারে।

সভ্যতার সামনে নতুন প্রশ্ন

১৯৩০-এর দশকে আমেরিকার মাঝখানে যে "Dust Bowl" বিপর্যয় হয়েছিল, সেটার একটা বড় কারণ ছিল কৃষির অতি-একঘেয়েমি। সমস্যার মূল কারণ শুধু খরা ছিল না। তার আগের দশকগুলিতে কৃষকরা বিপুল পরিমাণ প্রেইরি ঘাস কেটে ফেলে একই ধরনের ফসল—বিশেষ করে গম—চাষ করছিলেন। প্রাকৃতিক ঘাসের গভীর শিকড় মাটিকে শক্ত করে ধরে রাখত। কিন্তু অতিরিক্ত চাষের ফলে মাটি আলগা ও শুকনা হয়ে যায়।

তারপর যখন খরা এল, বাতাস সেই শুকনা মাটিকে তুলে নিয়ে বিশাল ধূলিঝড় তৈরি করল। দিনের বেলাতেও আকাশ অন্ধকার হয়ে যেত। অনেক সময় ধুলার মেঘ শহরের ওপর দিয়ে এমনভাবে বয়ে যেত যে মানুষ কয়েক ফুট দূরের বস্তুও দেখতে পেত না।

Dust Bowl-এর শিক্ষা হল—অতিরিক্ত পুনরাবৃত্তি ভঙ্গুরতা ডেকে আনে। কিন্তু এর উল্টা প্রান্ত, পুরোপুরি এলোমেলোতাও ভাল কিছু না।

এই পর্যন্ত পড়ে কারও মনে হতে পারে, যা কিছু হুবহু পুনরাবৃত্ত হয় না, তার ভেতরেই কোনো না কোনো গভীর নিয়ম লুকানো আছে। কথাটা ঠিক নয়।

একটা পুরোপুরি এলোমেলো সংখ্যা-তালিকা—যেমন র‍্যান্ডম নয়েজ—সেটাও কখনও পুনরাবৃত্ত হয় না। কিন্তু সেখানে কোনো সংগতি নেই। ফিবোনাচ্চি ধারা আর র‍্যান্ডম সংখ্যা—দুটিই পুনরাবৃত্তিহীন, কিন্তু এক জিনিস নয়।

পার্থক্যটা সম্পর্কের। ফিবোনাচ্চিতে একটা সংখ্যা পরবর্তী সংখ্যাকে নির্ধারণ করে। র‍্যান্ডম তালিকায় কেউ কারও সাথে যুক্ত নয়।

কেন প্রকৃতি এমন?

এর একটা সম্ভাব্য উত্তর—হুবহু পুনরাবৃত্তি স্থিতিশীলতা দেয় বটে, কিন্তু নমনীয়তা কেড়ে নেয়। একই গঠন বারবার করলে একটা ছোট ব্যাঘাতই পুরো ব্যবস্থা ভেঙে দিতে পারে। বৈচিত্র্যময় কিন্তু সম্পর্কিত গঠন বরং পরিবেশের পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে নিতে পারে। বিবর্তন তাই হুবহু কপির বদলে সম্পর্কিত বৈচিত্র্যকেই বেশি বেছে নিয়েছে।

বিজ্ঞান যত আগাচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে—মহাবিশ্ব কোনো স্থির যন্ত্র নয়। বরং এক গতিশীল সংগঠন, যেখানে নিয়ম আছে, কিন্তু সেই নিয়ম সবসময় সরল নয়।

হয়ত এই কারণেই প্রকৃতি কখনও পুরোপুরি একঘেয়ে নয়। সে শুধু নিয়ম মেনে চলে না, সে নতুনত্বও তৈরি করে।

#নিয়ম #পুনরাবৃত্তি #সম্পর্ক

Address

City Bank Center, 28, Gulshan Avenue, Gulshan 1, Bangladesh
Dhaka
1212

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Citytouch posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Contact The Business

Send a message to Citytouch:

Share