15/01/2022
ফ্যাশন ইউনাইটেড এর সূত্রমতে, গ্লোবাল অ্যাপারেল ও ফ্যাশন মার্কেটের ভ্যালু ৩ ট্রিলিয়ন বা ৩০০০ বিলিয়ন ডলার যা বিশ্বের মোট জিডিপির ২ শতাংশ। এর মাঝে ম্যানস ওয়্যার, উইম্যানস ওয়্যার, চিলড্রেন ওয়্যারের ১২০৯ বিলিয়ন ডলারের মার্কেট ছাড়াও ব্রাইডাল ওয়্যারের ৫৭ এবং স্পোর্টস ওয়্যারের ৯০.৪ বিলিয়ন ডলারের মার্কেট উল্লেখযোগ্য।
এই ওয়ার্ল্ড ফ্যাশন মার্কেটের প্রায় ৭৫ ভাগই ইউরোপ, আমেরিকা, চীন এবং জাপান কেন্দ্রিক। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বৃহত্তম পোশাক আমদানিকারক; আর এর প্রায় ৪০ শতাংশই শীপমেন্ট হয় চীন থেকে। ইউনাইটেড নেশনস অ্যালায়েন্স অন সাসটেইনেবল ফ্যাশন রিপোর্ট অনুযায়ী বিশ্বব্যাপী ফ্যাশন শিল্পে ৭৫ মিলিয়নেরও বেশি কাজ করে।
কিন্তু বিশ্বব্যাপী অন্যতম বৃহৎ এই মার্কেটের উত্থানের সাথে দিনকে দিন আশংকাজনক ভাবে কাপড়ের অপচয় বৈশ্বিক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাটি, পানি, বায়ু তথা পরিবেশকে কড়া মূল্য দিতে হচ্ছে এবং প্রাকৃতিক জলবায়ু পরিবর্তনে আসছে নেতিবাচক প্রভাব।
অপচয় ও পরিবেশ বিপর্যয়ের চিত্র
২০০০ থেকে ২০১৪; এই ১৫ বছরের ব্যবধানে গড় ভোক্তা ক্রয় ৬০ শতাংশ বৃদ্ধির সাথে পোশাকের উৎপাদন হয়েছে দ্বিগুণ। পোশাক ব্যবহারের এই আধিক্যের বিপরীতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ভঙ্গুর অবস্থার ফলাফল-
পোশাক তৈরিতে ফ্যাব্রিকের প্রায় ১৫ শতাংশ কাটিং রুমের মেঝেতে নষ্ট হয়। এই বর্জ্য হার কয়েক দশক ধরে শিল্প-ব্যাপী সহ্য করা হচ্ছে।
প্রতি ২ জনের মধ্যে ১ জন তাদের অব্যবহত জামাকাপড় সরাসরি আবর্জনার মধ্যে ফেলে দিচ্ছে। ফলাফল- প্রতি বছর উৎপাদিত ৩২ বিলিয়ন পোশাকের ৬৪ শতাংশ ল্যান্ডফিল করে।
শুধুমাত্র ২০০৯ সালেই একবার ব্যবহত পোশাক থেকে ২০৮ মিলিয়ন পাউন্ড বর্জ্য তৈরি হয়েছিল।
এনভায়রনমেন্টাল প্রোটেকশন এজেন্সি রিপোর্ট করেছে, আমেরিকানরা বছরে ১৬ মিলিয়ন টন টেক্সটাইল বর্জ্য তৈরি করে, যা নগরের মোট বর্জ্যের ছয় শতাংশের সমান।
ওয়ার্ল্ডওয়াইড রেসপনসিবল অ্যাক্রিডিটেড প্রোডাকশন (ডব্লিউআরএপি) এর তথ্য, প্রতিবছর যুক্তরাজ্যে ১৪০ মিলিয়ন পাউন্ড মূল্যের জামাকাপড় ফেলে দেওয়া হয় যা কেবল ল্যান্ডফিল করে।
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম ২০২১ সালের একটি রিপোর্টে ফ্যাশন এবং এর সাপ্লাই চেইন কে পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম দূষণকারী (খাদ্য ও নির্মাণের পরে) হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
ইউনাইটেড ন্যাশনস ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (ইউএনএফসিসিসি) জানিয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে ফ্যাশন ইন্ড্রাস্ট্রির কারনে গ্রিনহাউস গ্যাস এবং বর্জ্য নিঃসরণ মাত্রা বাড়বে ৬০ শতাংশ।
বিশ্বে যত কার্বন নিঃসরণ হচ্ছে, তার ১০ শতাংশের বেশি আসছে গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রি থেকে।
চীনের শীর্ষ ৩ পানি অপচয়কারী শিল্পের মধ্যে টেক্সটাইল একটি, সেখানে প্রতি বছর ২.৫ বিলিয়ন টন বর্জ্য পানি নিষ্কাশন হয়।
বিশ্বের মোট ব্যবহত পানির প্রায় ২০ শতাংশ খরচ হয়ে বর্জ্য পানি হিসেবে পরিবেশে মিশে যায় ফ্যাশন ইন্ড্রাস্ট্রির উৎপাদন থেকে।
ইন্ড্রাস্ট্রিতে প্রতিবছর পোশাক ও তুলা ওয়াশ এবং ডাই এর কাজে ১৫০০ বিলিয়ন লিটার পানি ব্যবহার হয়। এমনটা জানিয়েছে, ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি)।
একটি কটনের টিশার্ট কিংবা দুইটি জিন্স প্যান্টের কাপড়ের জন্য প্রয়োজনীয় তুলা উৎপাদনে ২০০০০ লিটার পানি খরচ করতে হয়।
ডাইং এবং প্রিন্টিং এ বছরে ৪৩ মিলিয়ন টন বিভিন্ন রাসায়নিক ব্যবহার হয়ে থাকে।
গ্রীন আমেরিকা টক্সিক টেক্সটাইল রিপোর্টে পাওয়া যায়, বিশ্বব্যাপী পানি দূষণে টেক্সটাইল ডাইং এর অবদান দ্বিতীয় বৃহত্তম ।
রিসাইকেল ও সেকেন্ড হ্যান্ড মার্কেট
ভোক্তারা প্রতি বছর গড়ে ৭০ পাউন্ড জামাকাপড় রিসাইকেল না করে ফেলে দেয়। পোশাকের ব্যবহার এবং রিসাইকেলের কমতির কারণে বার্ষিক ৫০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্য হারাতে হচ্ছে। জমি ভরাট করা কাপড়গুলির ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত পুনর্ব্যবহারযোগ্য হতে পারতো। তুলা রিসাইকেল করে ব্যবহার করলে প্রতি কেজিতে ২০,০০০ লিটার পানি সাশ্রয় করা যায়।
আবার সেকেন্ড হ্যান্ড পোশাকের বৃহত্তম রপ্তানিকারক দেশ যুক্তরাষ্ট্র বছরে ১ বিলিয়ন পাউন্ডের বেশি ব্যবহৃত পোশাক রপ্তানি করে থাকে। ২০২৯ সাল নাগাদ ফাস্ট ফ্যাশন সেকেন্ড হ্যান্ড মার্কেটের আকার দ্বিগুণ হবে বলে অনুমান করা হচ্ছে।
বস্ত্র আমাদের মৌলিক প্রয়োজনীয় পণ্য। এই শিল্পের আকার ক্রমেই বাড়তে থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এই ফাস্ট ফ্যাশনের গতিশীলতার কারনে প্রকৃতির অপ্রত্যাশিত বিসর্জন সত্যি কষ্টদায়ক এবং রীতিমতো মানবজীবনে বিশাল হুমকি।
২০৫০ সালের মধ্যে ভোক্তা চাহিদা মেটাতে বর্তমানের চেয়ে তিন গুণ প্রাকৃতিক সম্পদের প্রয়োজন হবে। একে বন্ধ করতে প্রত্যেকের সচেতনতা বাড়াতে হবে।
আপনার একটি পোশাকের জন্য প্রকৃতিকে কতটা মূল্য দিতে হচ্ছে তা ভাবুন এবং পোশাকের যত্ন ও সদ্ব্যবহার করুন। পুরানো কাপড় ফেলে দেবেন না। কাজে লাগান নানাভাবে, যেমনটা গ্রামের মহিলারা শাড়ি-লুঙ্গি কাজে লাগায় কাঁথা সেলাই সহ অনেকভাবে।
ইন্ড্রাস্ট্রিগুলোর জোর দিতে হবে ইকো ফ্রেন্ডলি ফ্যাশনে, আপসাইক্লিং আর রিসাইক্লিং বাড়াতে হবে শপগুলিতে। পুরানো কাপড় দিয়ে তৈরি করতে হবে নতুন নতুন আউটফিট।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সমন্বয়ে একটি টেকসই ও পরিবেশ বান্ধব ফ্যাশন শিল্প গড়ার মাধ্যমে উত্তরণ হতে হবে এই বৈশ্বিক সংকট থেকে।