12/12/2023
ডিস্কাউন্টেড ক্যাশ ফ্লো (DCF) মেথডে ভ্যালুয়েশন করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হল ডিস্কাউন্ট রেট নির্ণয়। এটা অনেকেই সূত্রে বসায় ঠিকই, কিন্তু বুঝতে পারেনা কি করছে আসলে। আজকে সেটাই আলোচনা করব।
ভ্যালুয়েশন হচ্ছে সকল ভবিষ্যত ক্যাশ ফ্লোর বর্তমান মূল্য। তারমানে ভবিষ্যতে আপনি বছর বছর যে ক্যাশ ফ্লো পাবেন বলে আশা করছেন, সেগুলোকে আজকের মূল্যে প্রকাশ করতে হবে। সেজন্য লাগবে ডিস্কাউন্ট রেট।
ধরুন, আপনি এই বছর ১০০ টাকা সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করে পরের বছর সম্পূর্ণ রিস্ক ফ্রি ১০% ইন্টারেস্ট পাবেন এবং মূল টাকাও ফেরত পাবেন। অর্থাৎ, পরের বছর আপনার ক্যাশ ফ্লো হবে ১১০ টাকা। তাহলে পরের বছরের ১১০ টাকার বর্তমান মূল্য কত? ১১০÷(১+১০%) = ১১০÷১.১ = ১০০ টাকা, এটাই তো আপনি বর্তমানে বিনিয়োগ করছেন এই বছর, নাকি? অর্থাৎ আপনার সঞ্চয়পত্রের বর্তমান মূল্য ১০০ টাকা। এখানে এই ১০% হল ডিস্কাউন্ট রেট। অর্থাৎ, ভবিষ্যতে যে রেটে আপনি প্রফিট বা ইন্টারেস্ট আশা করছেন সেই এক্সপেক্টেড ইন্টারেস্ট রেটই হচ্ছে ডিস্কাউন্ট রেট। এই রেটের সাহায্যে আপনি পরের বছরের ক্যাশ ফ্লো থেকে ডিস্কাউন্ট করে এই বছরের বিনিয়োগের মূল্য পেয়ে গেলেন। এই হল একদম প্রাথমিক ধারণা।
এখানে আপনার বিনিয়োগ ১০০% রিস্ক ফ্রি ছিল অর্থাৎ, কত টাকা ফেরত পাবেন সেটা ছিল গ্যারান্টেড। কিন্তু ব্যবসা গ্যারান্টেড কিছু নয়। এখানে রিস্ক আছে। অনেকেই হয়তো জানেন না, ডিস্কাউন্ট রেট মূলত বিজনেস রিস্কের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত।
ধরুন, আপনার বন্ধু আপনাকে তার কোম্পানির শেয়ার কিনতে বলল। শেয়ারপ্রতি মূল্য দাবি করল ১ লক্ষ টাকা। বন্ধুটি আপনাকে প্রতিশ্রুতি দিল তার বিজনেস বেশ স্টেবল এবং প্রতি বছর শেয়ারপ্রতি প্রায় ১০ হাজার টাকার মত প্রফিট হবে (যদিও শেয়ারপ্রতি প্রফিট বা ইপিএসের চেয়েও ভ্যালুয়েশনের অধিকতর সঠিক মাপকাঠি হচ্ছে ফ্রি ক্যাশ ফ্লো, এখানে সহজভাবে বোঝানোর জন্য ইপিএস ধরে নিলাম) এবং প্রফিটের পুরোটাই আপনাকে দিবে সারাজীবন। তারমানে প্রায় ১০ বছরে আপনার পুঁজি উঠে আসবে এবং এরপর থেকে আপনি যা পাবেন তাই লাভ। আপনার বন্ধুর অফার অনুযায়ী, কোম্পানিটির ইপিএস প্রায় ১০ হাজার টাকার মত হবে প্রতিবছর এবং যেহেতু আপনি ১ লক্ষ টাকায় প্রায় ১০ হাজার টাকা পাচ্ছেন প্রতি বছর, তাই আপনার এক্সপেক্টেড ইন্টারেস্ট রেট ১০%।
এখন তার ব্যবসাটি ভালভাবে বুঝে আপনি যদি আশ্বস্ত হন যে আপনার বন্ধুটি বিশ্বস্ত এবং দক্ষ, প্রতি বছর ব্যবসা করে সে আপনাকে প্রায় ১০ হাজার টাকা করে দিতে পারবে এবং ব্যবসাটি অন্তত ১০ বছর টিকে থেকে অন্তত আপনার পুঁজি ফেরত দিবে, তাহলে আপনি তার অফার গ্রহণ করতে পারেন।
কিন্তু আপনার যদি মনে হয় ব্যবসাটি এতটাই রিস্কি যে এটার ১০ বছর টিকে থাকতেই কষ্ট হবে তখন আপনি কি করবেন? আপনি তখন চেষ্টা করবেন আপনার পুঁজি আরও দ্রুত উঠিয়ে ফেলতে। এটা শুধু তখনই সম্ভব যখন আপনি এক্সপেক্টেড ইন্টারেস্ট রেট বাড়িয়ে দিবেন। অর্থাৎ, ব্যবসাটি থেকে ইয়ারলি বেশি প্রফিট আশা করবেন যেন দ্রুত পুঁজি উঠে যায়। কত দ্রুত উঠাবেন, সেটা নির্ভর করে ব্যবসাতে কত বেশি রিস্ক আছে তার উপর। যদি মনে হয় ৫ বছরের পর কোম্পানি টিকবে কিনা গ্যারান্টি নেই, তখন আপনি চাইবেন ৫ বছরে যেন পুঁজি উঠে আসে। অর্থাৎ, বছরে যেন আপনি ২০% করে প্রফিট পান এটাই হবে আপনার কাউন্টার অফার। কিন্তু বছরে আপনাকে ২০% প্রফিট দিতে হলে তো ইপিএস হতে হবে ২০ হাজার টাকা। কিন্তু আপনার বন্ধু তো বলেই দিয়েছে মোটামুটি ১০ হাজার টাকা ইপিএস জেনারেট করতে পারে তার কোম্পানি। হঠাৎ করে তো আর কোন কোম্পানির ইপিএস ২ গুণ হবে না। তাহলে শেয়ারপ্রতি ২০ হাজার টাকা কোথা থেকে আসবে? তাই, এই অফারটি আপনার বন্ধুর পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। তাহলে উপায়? উপায় হল ১০ হাজার টাকা ইপিএস থেকেই ২০% প্রফিট দিতে হবে। এটা শুধু তখনই সম্ভব যখন শেয়ারের দাম ১ লক্ষ টাকা না হয়ে ৫০ হাজার টাকা হবে। ১০ হাজার ÷ ৫০ হাজার = ২০%। তাই আপনি তখন বন্ধুকে শেয়ারপ্রতি ৫০ হাজার টাকা অফার করবেন। এভাবে আপনি ডিস্কাউন্ট রেটকে ১০% থেকে ২০% করে শেয়ারের ভ্যালুয়েশন কমিয়ে আনলেন এবং সঠিক দামে শেয়ারটি কিনলেন। মনে রাখতে হবে, এখানে সরলীকরণ করার জন্য ডিস্কাউন্ট রেটকে সরল সুদ আকারে দেখানো হয়েছে। বাস্তবে এটা কম্পাউন্ড ইন্টারেস্ট।
তাহলে দেখা যাচ্ছে রিস্কের সাথে ডিস্কাউন্ট রেটের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। রিস্ক বেশি হলে এক্সপেক্টেড রিটার্ন বেশি হবে, তারমানে ডিসকাউন্ট রেট বেশি হবে এবং বিজনেসের ভ্যালুয়েশন কমে যাবে।
শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের এরকম অসংখ্য কনসেপ্ট রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সকল কনসেপ্ট একসাথে পাবেন "শেয়ার মার্কেট ইনভেস্টিং মাইন্ডসেট" বইটিতে।