09/12/2023
বাংলাদেশের বিনিয়োগ ব্যবস্থার বাস্তবতা এবং তৃতীয় পক্ষ।
লেখাটি একটু বড় হতে যাচ্ছে। সুতরাং যারা ইতিমধ্যে বিনিয়োগ করেছেন, সামনে করবেন অথবা বিনিয়োগ নিবেন তাঁরা লেখাটি মনোযোগ দিয়ে পড়বেন।
বাংলাদেশের বিনিয়োগ ব্যবস্থা মোটেও সহজ এবং নির্ভরযোগ্য নয় আপাতত এখন পর্যন্ত। এটার পেছনে প্রধান কারণ আমাদের দেশের মানুষদের মেন্টালিটি। আমাদের দেশের বেশীরভাগ মানুষ প্রচুর পরিমাণে একে-অপরের উপর বিশ্বাসহীনতায় থাকেন। ফলস্বরূপ কোন উদ্যোগ বা ব্যবসা শুরু কিংবা প্রসারের জন্য বিনিয়োগ কালেক্ট করা বেশ কষ্টসাধ্য বিষয়৷ ট্রেডিশনাল বিজনেসে যেখানে ইনিশিয়াল রেভিনিউ এবং প্রফিট আসে সেখানেও মানুষ বিনিয়োগ করতে দ্বিধাগ্রস্ত থাকে, এই পরিস্থিতিতে নতুন কোন স্টার্টআপ যেটা আদৌও কাজ করবে কিনা সেখানে বিনিয়োগ এক্সপেক্ট করা খানিকটা বোকামির মত শোনায়। ফলে বেশীরভাগ স্টার্টআপ ফাউন্ডার শুরু থেকেই তাকিয়ে থাকেন ফরেন ফান্ডিং এর জন্য৷ কোন কালে বিদেশী কোন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যাংক দেবদূত হয়ে এসে বিনিয়োগ করবেন সে আশা করা ছাড়া তেমন কোন উপায় থাকেনা। তবে বিশ্বব্যাপী চলমান অস্থিরতা, যুদ্ধসহ নানান ইস্যুর কারণে ডলারের দাম যে হারে উঠানামা করছে তাতে করে ফরেন ফান্ড নিয়ে বিজনেস করে প্রফিট আসলেও খুব বেশী স্বস্তি পাওয়া যাইনা। কেননা কেউ যদি ১০০ টাকা হারে ১০০ ডলার ফান্ড রেইজ করেন তাহলে উনি বাংলাদেশী টাকায় ১০ হাজার টাকা রেইজ করলেন৷ এই টাকাকে কাজে লাগিয়ে প্রতিমাসে ৫ হাজার টাকা প্রফিট করলেন। তাহলে মোট এসেটের পরিমাণ দাঁড়ালো ১৫ হাজার টাকা। ডলারের মূল্যের অস্থিরতার কারণে হঠাৎ করে ডলারের দাম একমাস পরে ১৩০ টাকা করে হয়ে গেলো। ঋণ পরিশোধের সময় তো বর্তমান মূল্য অনুযায়ী পরিশোধ করতে হবে৷ ফলে যেখানে খাতা কলমে মুনাফা ৫ হাজার টাকা হওয়ার কথা, সেখানে ডলারের দাম বেড়ে যাবার কারণে মুনাফা হলো মাত্র ২ হাজার টাকা। এখন ইনভেস্টরের সাথে প্রফিট শেয়ার করার পর দেখা যাবে কোম্পানি লসে আছে।
আবার কোন যেকেউ চাইলেই কোন প্রতিষ্ঠানের জন্য ফরেনফান্ড কালেক্ট করতে পারবেন না৷ অবশ্যই সেটিকে ফান্ড কালেক্টের জন্য এলিজেবল হতে হবে। এলিজেবল হওয়ার জন্য নিজের বিজনেসের হিস্ট্রি, মার্কেট এনালাইসিস, প্রপার প্রজেকশন, কনজিউমার ডাটা, বিজনেস ভিজিবিলিটি (বেশীরভাগ ক্ষেত্রে) প্রয়োজন। সেটা এসিভমেন্টের জন্য অবশ্যই কোম্পানির একটা প্রাইমারি প্রিয়ড নিজে নিজেই সার্ভাইব করতে হয়৷ এই সময়টাই একজন উদ্যোক্তার জন্য সবচেয়ে কঠিন সময়।
একটি উদ্যোগের শুরুতে ব্যবসায়িক অপারেশন রান করানোর জন্য উদ্যোক্তা প্রাথমিকভাবে ব্যক্তিগত ফান্ডিং ব্যবহার করতে হয়। অনেকসময় এই ফান্ডিং আসে নিজের পকেট, পরিবার, বন্ধু-বান্ধব, আত্নীয়স্বজন থেকে। শুরুতেই বলছিলাম বাংলাদেশে বিনিয়োগ ব্যবস্থা এতটাও সহজ নেই যে কেউ চাইলো আর বিনিয়োগ পেয়ে গেলো। শুরু এই সময়টাতে বেশীরভাগ বিজনেস কোলাপস করে। কেননা বেশীরভাগ আইডিয়া শুধুমাত্র আইডিয়ার স্তরেই বেশ সুন্দর আর প্রপার দেখায় বাট এক্সিকিউশনে সেটা ফেইল করে। আবার কোন আইডিয়া কাজ করা স্টার্ট করলেও প্রায় শুরুর দিকেই বিনিয়োগকারীরা (বন্ধু-বান্ধব, আত্নীয়স্বজন) বিনিয়োগ উঠিয়ে নিতে চাই। ফলে একটি বিজনেস শুরুর দিকেই মুখ থুবরে পরে।
এবার আসি এর পরের ধাপে। একটি বিজনেস এই প্রাইমারি ধাক্কাটা কোন রকমে পার করলেও পরবর্তী ধাপে একপানশনের ক্ষেত্রে সমস্যা ফেইস করে। দরকার হয় বড় এমাউন্টের বিনিয়োগ। তখনই শুরু হয় আসল খেলা। শুরুতেই বলছিলাম আমাদের দেশের বিনিয়োগকারীরা কি ব্যবসায়, কোন ব্যবসায় টাকা ঢালছেন এটা নিয়ে মোটেও ইন্টারেস্টেড না। তাদের মেইন ইন্টারেস্ট থাকে ইন্টারেস্ট বা মুনাফার উপর। আমি এত টাকা দিবো, আমাকে কত টাকা মাসে মুনাফা দিবেন এই কথায় বিশ্বাসী তারা। ব্যবসা কিংবা উদ্যোক্তা বাঁচলো কি মরলো সেটা দেখার দায়িক্ত তাদের একেবারেই নেই, তাদের মাথা ব্যাথা শুধু প্রফিট নিয়ে। মুনাফাকে রীতিমতো সুদের স্টেইজে নিতে পারলেই উনাদের শান্তি। ইনারা ব্যাংকে টাকা রাখবেন না কেননা সেটা সুদ হয়, কিন্তু কোন ব্যবসায়ে বিনিয়োগ করার জন্য ব্যাংকের মত সুবিধা যেমন: মাসের টাকা মাসেই, একটা ফিক্সড প্রফিট আর ব্যাংকের মত যখন ইচ্ছা তখন বিনিয়োগ উঠানোর ব্যবস্থা থাকতে হবে নতুবা তারা বিনিয়োগ ইন্টারেস্টেড না।
এখন এটা খুবই কমনসেন্স যে একটা ব্যবসা কখনোই তাঁদের ইনভেস্টরদের ব্যাংকের মত সার্পোট দিতে পারবেনা। ব্যাংক একজনের থেকে বছরে ৮-১০% সুদ হারে টাকা নিয়ে আরেকজনকে ১০-১৫% হারে ঋণ দিচ্ছে। যারা ঋণ নিচ্ছে তাদের থেকে জোর-জবরদস্তি করে সুদ আদায় করে ব্যাংকে টাকা রাখা মানুষকে সুদ দিচ্ছে তাই সমস্যা হবার কথাও না। কিন্তু একটা বিজনেস খুবই আনস্টেবল। রেভিনিউ/প্রফিট ভেরি করবে, কখনো বিজনেস ভালো চলবে-কখনো খারাপ চলবে এটাই স্বাভাবিক সুতরাং কোন ব্যবসায়ে বিনিয়োগ করে ব্যাংকের মত ফ্যাসিলিটিস আশা করা নিছক বোকামি৷ ব্যাংকের প্রফিট রেশিওর তুলনায় ব্যবসায়ের প্রফিট রেশিও বেশ বেশী। ব্যাংকের কাছে টাকা লিকুইড হিসেবে থাকে কিন্তু ব্যবসায়ে এক্সিকিউশনের জন্য টাকা ব্যয় হয় ফলে ব্যাংক থেকে নিজের টাকা উঠানো বেশ সহজ, যেকোনো সময় ব্যাংক একজনের টাকা ফেরত দিতে পারে অপরদিকে কোন ব্যবসা থেকে হুট করে টাকা উঠনো সম্ভব নয় কেননা টাকা এক্সিকিউশনে ব্যয় হয় লিকুইড হিসেবে থাকেনা। ব্যবসা থেকে বিনিয়োগ উঠাতে হলে অবশ্যই ফাউন্ডার বা ব্যবসায়ীকে কোন একটা এসেস্ট বিক্রি করে টাকা ফেরত দিতে হবে যেটা ব্যবসায়ের জন্য ক্ষতির।
এখানে যদি কোন ব্যাংক থেকেও একই সাথে অনেকে টাকা উঠিয়ে নিতে চাই তাহলে ব্যাংকেরও কোলাপস করবার সম্ভাবনা থাকে।
এখানে এই অবস্থার সুযোগ নেয় তথাকথিত কিছু এসেস্ট ম্যানেজমেন্ট ব্যক্তি/গ্রুপ/কোম্পানি। তাঁরা বিভিন্ন মানুষের থেকে বিনিয়োগ সংগ্রহ করে এবং সেটা কোন ব্যক্তি কিংবা ব্যবসায়ে ইনভেস্ট করে। সেখান থেকে যেই মুনাফা আসে সেটার একটা অংশ নিজে রেখে দেয় এবং একটা অংশ আসল বিনিয়োগকারিকে দেয়। আপাত দৃষ্টিতে বিষয়টা খুবই ইনভেস্টর এবং বিজনেস ফ্রেন্ডলি মনে হলেও আদতে কিন্তু তা নয়৷ বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই এরুপ ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠান কিংবা কোম্পানি হয় স্বার্থলোভী। ধরুন একটা ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান ২-৫% হারে ইনভেস্টমেন্ট নিচ্ছে নিজের ব্যবসায় প্রসারের জন্য। আপনি সেখানে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী নন কেননা এত বেশী হারের মুনাফা অফার করা সত্ত্বেও আপনি ঐ ব্যবসায়ের উপর আস্থা পাচ্ছেন না। যদি তাঁরা আপনার টাকা নিয়ে ভেগে যাই তাহলে?
কিন্তু আপনি বিনিয়োগকারী আর তাই আপনি তো বিনিয়োগ করবেনই। তাই আপনি কোন একটা এসেস্ট ম্যানেজমেন্টের সাথে যুক্ত কোন ব্যক্তি, গ্রুপ অথবা কোম্পানির কাছে গিয়ে বললেন আপনার টাকা আছে আপনি বিনিয়োগ করতে আগ্রহী। সেই লোক, গ্রুপ অথবা কোম্পানি আপনাকে জানালো তাদের কাছে একটা অফার আছে। আপনি চাইলে মাসিক ১-১.৫% হারে তাঁদের কাছে হালাল বিজনেসে বিনিয়োগ করতে পারবেন। আপনিও এই প্রফিটে বেশ খুশি কেননা আপনার প্রিন্সিপাল তো সিকিউরড। তাই খুশি মনে আপনি ১০ লাখ টাকা সেখানে বিনিয়োগ করলেন। এবার সেই ব্যক্তি/গ্রুপ বা কোম্পানির তো নিজের কোন বিজনেস নাই আবার টাকা ছাপানোর যন্ত্রপাতি কিংবা গাছও নাই যে মাস শেষে আপনাকে সেখান থেকে মুনাফা দেবে। তাই তারা ঐরকম ব্যবসা প্রতিষ্ঠান যেটার কথা শুরুতে বলছিলাম যেটা ২-৫% প্রফিট দিচ্ছে তাঁদের সাথে কনট্রাক করবে। তাদের কাছে এসে বলবে দেখেন ভাই আমি আপনাকে টাকা দেবো, আমার ৫% প্রফিট কিংবা ভ্যারিয়েবল প্রফিটেরও দরকার নাই। আমার কাছে ১০ লাখ টাকা আছে যেটা আপনাকে দিচ্ছি আর আপনি আমাকে মাসিক ৪% ফিক্সড প্রফিট দিবেন। অগত্যা ব্যবসায়ি নিজের ব্যবসার প্রসারের জন্য সেটাতেই রাজি হলো কারণ তার অফারই ছিলো ৩-৫% সুতরাং ৪% প্রফিট তার রেঞ্জের মধ্যেই আছে। সেই সে ব্রকারের সাথে মাস শেষে প্রফিটও শেয়ার করছে ৪%। এবার সেই গ্রুপ আপনার ১০ লাখ টাকা দিয়ে উদ্যোক্তার কাছ থেকে ৪০ হাজার টাকা মাসিক প্রফিট কালেক্ট করে আপনার সাথে ১০-১৫ হাজার টাকা শেয়ার করছে। আপনিও খুশি কেননা আপনার মুলধন নিরাপদে আছে আর আপনি ব্যাংকের থেকে ডাবল প্রফিটও পাচ্ছেন, ব্রকার বা দালাল (এসেস্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি) ও খুশি কেননা সে কিছু না করেই মাসে আপনার থেকে ২৫-৩০ হাজার টাকা ইনকাম করছে আর ব্যবসায়ীও খুশি কেননা সে তাঁর টার্গেট অনুযায়ী তার রেঞ্জের মধ্যে প্রফিট শেয়ার করছে।
এখন ধরেন আপনার ভয়টা যদি আসলেই সত্যি হয়ে যায়! টাকা যেই বিনিয়োগ করুক ঐ ব্যবয়াসী যদি সত্যি সত্যি ভেগে যাই কিংবা ব্যবসায়ের কোন ক্ষতি হয় তাহলে? এসেস্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির তো নিজের কোন এসেস্ট নেই তাহলে আপনার টাকা সে কিভাবে ফেরত দেবে? আপনি যদি সরাসরি ব্যবসায়ে বিনিয়োগ করতেন তাহলে ব্যবসায়ে ক্ষতি হলেও ব্যবসায়ি কিছু হলেও তো আপনাকে ফেরত দিতে পারতো কেননা তাঁর ব্যবসায়ের কিছু হলেও ভিজিবল এসেস্ট আছে সাথে আপনিও ভালো রেশিওর প্রফিটও সরাসরি এভেইল করতে পারতেন কিন্তু আপনার তো অনেক নিরাপত্তা লাগবে যার কারণে সেটা এসিওর করতে গিয়ে আপনি আম-ছালা দুটোই হারালেন। ঐ ব্যবসায়ী ভেগে গেলে কিংবা লস করলে এসেস্ট ম্যানেজারও ভাগবে৷ কারণ অন্যের কাছ থেকে টাকা এনে সে আপনার সাথে শেয়ার করছে কিন্তু ১০ লক্ষ টাকা নিজের পকেট থেকে আপনাকে দিবে এটা রেয়ার।
এখন পছন্দ আপনার। আপনি যখন বিনিয়োগকারী তখন অবশ্যই আপনাকে কয়েকটা বিষয় দেখেশুনে নিতে হবে আর নিজেই সরাসরি বিনিয়োগ করতে হবে৷ তবে আমার মনে হয় কয়েকটা বিষয় এনশিওর করতে পারলেই আপনার ৬০-৭০% ঝুঁকি গায়েব এটা নিশ্চিত। এগুলোর মধ্যে রয়েছে আপনি যেই বিজনেসে বিনিয়োগ করছেন সেটার বয়স কত? যদি ৩-৪ বছরও হয় তাহলে মনে করবেন আপনি ৩০% ঝুঁকিমুক্ত। এই বিজনেস ভাগলে বা কোলাপস করলে আগেই করতো। ৩-৪ বছর সার্ভাইব করছে মানে তারা ঠিকঠাকই এগোচ্ছে। তারপর আপনি যেই বিজনেসে বিনিয়োগ করছেন সেটার সাসটেইনেবলিটি কেমন? যদি আগামী ৫-১০ বছরও ঐ ব্যবসায়ের চাহিদা থাকে তাহলে আপনি বিনিয়োগ করতে পারেন কোন দ্বিধা ছাড়াই। আবার আপনি যেই ব্যবসায়ে বিনিয়োগ করছেন সেটার উদ্যোক্তা কে বা তাঁর ব্যকগ্রাউন্ড কি? বিনিয়োগ চুক্তিপত্র কিভাবে সংগঠিত হচ্ছে? কেন তাঁরা বিনিয়োগ নিচ্ছে বা বিনিয়োগ ব্যবসায়ের কোন কাজে লাগাচ্ছে এই বিষয়ে সঠিক ধারণা আপনাকে রাখতেই হবে নতুবা আপনার বিনিয়োগ করার কোন দরকারই নাই। আপনার টাকা ব্যাংকে অথবা বালিশের নিচে, আলমারিতে বেশী ভালো থাকবে।
আরেকটা বিষয়; যখন কোনো ব্যবসায়ে বিনিয়োগ করবেন তখন অবশ্যই একটু নরমাল আর উদার মেন্টালিটি নিয়ে আসবেন। অভার ফ্রাস্টেটেড হবেন না, অনেক বেশী এক্সপেকটেশনও রাখবেন না৷ ব্যবসা মানেই ঝুঁকি আর ব্যবসায়ীর মত আপনাকেও ঝুঁকি নিতে হবে। একজায়গায় নিজের সব অর্থ বিনিয়োগ করবেন না। ডাইভারসিফিকেশন করেন, সেভারেল প্লেসে ইনভেস্ট করেন। আর নিজের এবং পরিবারের ইমার্জেন্সী ফান্ড, অতি লাভের আশায় ঋণ করে, অন্যের থেকে ধার করে কোথাও বিনিয়োগ করবেন না।
ধন্যবাদ