28/11/2025
একজন প্রশ্ন করেছেন,
বর্তমানে বাংলাদেশে ইসলামি ব্যাংক নামে যেসব ব্যাংক পরিচালিত এই ব্যাংকগুলোতে যে কোনো মেয়াদী ডিপিএস রাখা, তার লভ্যাংশ গ্রহণ করা শরীয়তের দৃষ্টিতে হালাল বা জায়েজ কি না?
এটা খুবই সাদামাটা প্রশ্ন। ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশে প্রথম 'ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ' প্রতিষ্ঠা ও চালু হবার পর গত ৪২ বছর ধরে ইসলামী ব্যাংকে যারা চাকুরী করেছেন বা এখনো করছেন কোন না কোনোভাবেই এসব প্রশ্ন কমনলি শুনে আসছেন এবং উপযুক্ত জবাবও দিয়েছেন।আমার মনে হয়না এখনো এসব বিষয়ে বিভ্রান্তি আছে তবুও কিছু লোকের উদ্দেশ্যই হচ্ছে ইসলামী ব্যাংকিং ও অর্থব্যবস্থাকে নেতিবাচক ও হারাম প্রমাণ করতে এবং একাজে তাদের প্রয়াসের অন্ত নেই! অন্যদিকে তৃণমূল অর্থনীতিকে ইসলামীকরণের লক্ষ্যে ১৯২২ সালের প্রতিষ্ঠিত দি সন্দ্বীপ সেন্ট্রাল কো-অপারেটিভ ব্যাংক লিমিটেড কে দীর্ঘ প্রচেষ্টা পর অবশেষে ২০১৪ সালে মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের ডিভিশনের আদেশ মূলে সংশোধন পূর্ব ইসলামীকরণ করা হয়। ঠিক একইভাবে ফাস্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, আল-আরাফা ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, NRBগ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠা হয়। সারাদেশে ইসলামী ব্যাংকিংএর প্র্যাকটিস চালু হয়। কিন্তু দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ইসলাম বিদ্বেষী একটি চক্র এদেশের অর্থনীতি ও ব্যাংকিং ব্যবস্থা ইসলামীকরণের বিরুদ্ধে শুরু থেকেই লেগে আছে। নানা ধরনের প্রশ্ন তৈরি করে বিদ্বেষ মূলক কথাবার্তা ও লেখালেখির মাধ্যমে তারা দমিয়ে দিতে চায় ইসলামী অর্থব্যবস্থার অগ্রযাত্রা। ইসলামবিদ্বেষী এ ধরনের ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তকে সরলভাবে 'মূর্খতাবশতঃ' বলার কোন কারণ নেই, এর পেছনে আন্তর্জাতিক ইহুদি নাসারা কুফ্ফার মোশরেক এবং রামপন্থী বামপন্থী চক্রের 'উদ্দেশ্য হচ্ছে' ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত করা।
আমি খুবই বিস্মিত যে একটি পত্রিকার সাপ্তাহিক 'ধর্মীয় জীবন' পাতায় একজনের এমন প্রশ্নের জবাবে এক মুফতি সাহেব ফতোয়া দিলেন, --
"আমাদের দেশে বর্তমানে শরীয়া মোতাবেক পরিচালিত হওয়ার দাবিদার ইসলামী ব্যাংকগুলো তাদের বিনিয়োগে যথাযথভাবে শরীয়তের নীতিমালা অনুসরণ করে না। তাই শরীয়তের এ সংক্রান্ত নীতিমালা যথাযথভাবে পালনের ব্যাপারে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এসব ব্যাংকে ডিপিএস, এফডিআর বা অন্য কোনো সেভিং একাউন্টে টাকা রেখে অতিরিক্ত গ্রহণ করা যাবে না।"
বেশ উত্তম কথাই বটে! এখন এই 'নিশ্চিত' করার দায়িত্ব কার? কাস্টমারের, নাকি ব্যাংক কর্তৃপক্ষের, নাকি তৃতীয় কোনো শরীয়াহ এক্সপার্টের? শরীয়াহ ভিত্তিক লেনদেনের শর্ত কি? প্রশ্নকর্তা যদি নিজেই লিটমাস পেপারে অংকিত ইসলামী ব্যাংকের প্রোডাক্টকে শরীয়াহ’র দ্রব্যে চুবানি দিয়ে পরখ করতে পারতেন তাহলে তা তাৎক্ষণিক জানা যেত। কিন্তু সে উপায় নেই। সে কারণে শরীয়াহ ব্যাংকগুলোর টেস্টিং ল্যাবরেটরীতে 'ডেমনেস্ট্রেটর' নিয়োগ দেয়া হয়। স্কুল কলেজের বিজ্ঞান প্রাকটিক্যাল ক্লাসে এরকম অনেক ডেমনেস্ট্রেটরের সংগে আমাদের বেজায় খাতির ছিলো।
ইসলামী ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম ও লেনদেন ইসলামী কিনা সেটা দেখার মূল দায়িত্ব কাষ্টমারের নয়। তিনি ব্যাংক কর্তৃপক্ষের নিশ্চয়তার উপর ব্যাংকে হালাল জ্ঞানে ডিপোজিট করবেন। ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে তার প্রোডাক্ট হালাল কিনা সেটা ঠিক করে দিবে শরীয়াহ বিষয়ে যথেষ্ট অভিজ্ঞতা আছে এমন ফকিহগণ।বাংলাদেশের সকল ইসলামী ব্যাংক-এর শরীয়াহ বোর্ড থাকা বাধ্যতামূলক। এটি ব্যতিত কেন্দ্রীয় ব্যাংক লাইসেন্স ইস্যু করেনা। শরীয়াহ বোর্ডের সকল সদস্যই আমাদের দেশের নামকরা আলেম, তাদেরকে সকলেই চিনে ও জানে। আপনি সরাসরি যেভাবে বললেন, কোনো ইসলামী ব্যাংকই সহীহ্ শুদ্ধভাবে চলেনা; তাহলে এর জন্য তো ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বা কাষ্টমার দায়ী নয়, বরং যিনি ফতোয়া দিলেন তার মতো মাদ্রাসা ব্যাকগ্রাউন্ডের নামকরা ফকিহগণ যারা ঐসকল ব্যাংকের শরীয়াহ বোর্ডের সদস্য হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন তারাই দায়ী। তাহলে ব্যাপারটা কি দাঁড়ালো?....
দ্বিতীয় বিষয়টা আরেকটু পরিষ্কার করি।আপনার কথামতো এক সেকেন্ডের জন্য ধরেই নিলাম ইসলামী ব্যাংক ইসলামী শরীয়ত মতো চলেনা। তাহলে আপনার অপশন কি? মনে কিছু নিবেন না, তাহলে আপনি আপনার মসজিদ, মাদ্রাসার লেনদেন কি সোনালী, রূপালী, জনতা বা ন্যাশনাল ব্যাংক-এ করবেন যেখালে প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়ে সুদ দেয় ও সুদ খায়? সেই '৮৩ সালের ঘটনা। আমি এরকম এক মার্কাজে ডিপোজিট আনতে গেলে উনারা আমাকে ব্যর্থ ও বিমুখ করে দিয়ে বললেন, ”আমরা লোকদের আখিরাতের পথে আহ্বান করি আর আপনি এসেছেন আমাদের দুনিয়ার দাওয়াত দিতে।” মনে মনে খুব রাগ হলেও সেটা চেপে রেখে বিনয়ের সাথে বললাম, হুযুর আপনার টাকা কোথায় আছে এখন? তিনি বললেন, সোনালী ব্যাংক-এ। বললাম, ধরুন হাশরের দিন আপনার আমলনামায় পাপ-পূণ্য সমান সমান হলো। আল্লাহ্ অপশন দিলেন, তুমি কি দোজখে যাবা, নাকি আরো কিছু কামাই করার জন্য দুনিয়ায় ফেরত যাবা? পাঠক বাকীটা বুঝে নিন। আপাততঃ দুনিয়া কি জাহান্নাম থেকে ভালো নয়?
তৃতীয় বিষয়টা আরো গুরুত্বপূর্ণ। সুদ হারামের বিষয়ে কোন বিতর্ক নেই।সুদভিত্তিক ব্যাংকগুলো কোন রাখঢাক ছাড়াই বলে কয়ে আপনাকে সুদ দেয়। বাজারের কোন সুপার শপে শুকরের গোশত বিক্রয় হলে আপনি যেমন হারাম বলে খরিদ করেন না তেমনি সুদও। সুদের বড় রকমের গুনাহের ব্যাপারেও কারো কোন সংশয় নেই। আপনি যদি মনে করেন ‘ইসলামী ব্যাংক’ তাদের লেনদেনও একশতভাগ হালাল করছে না বা করতে পারছে না। ওকে। ধরে নিলাম ৮০ ভাগই হারাম। তাহলে বাকী ২০ ভাগ তো হালাল আছে। সোনালী ব্যাংক পক্ষান্তরে যা দেয় তার তো একশতে একশত ভাগই হারাম।নাকি? তাহলে আপেক্ষিকভাবে হলেও ইসলামী ব্যাংক আপনার গ্রহনীয় হওয়া উচিত। এটা কেবল একটি গাণিতিক উদাহরণ মাত্র।
এবারে আসুন, আপনার তাকওয়ার প্রশ্নে আপনি কি করতে পারেন? প্রথমতঃ সব ধরনের আর্থিক লেনদেন মুক্ত হয়ে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে তথা বনবাসে বৈরাগী জীবন যাপন করতে পারেন, এরকম নিরুপদ্রব জীবন যদিও ইসলামে সমর্থিত নয়। আর না হয় বাজারে প্রচলিত অপশনগুলোর মধ্যে যেটি অপেক্ষাকৃত কম ক্ষতিকর সেটি গ্রহন করতে পারেন। এটাই শরীয়াহ’র অগ্রাধিকারের মাসআলা। দুনিয়ায় চলতে হলে, ব্যবসা বানিজ্য করতে হলে ব্যাংকের সেবা নেয়া ভিন্ন কোনো বিকল্প নেই। তাই কম ক্ষতিকরটি গ্রহন করা নাজায়েজ কিছু নয়।
কোনরকম স্টাডি ব্যতিত হুট করে “ইসলামী ব্যাংকগুলোতে ফিক্সড ডিপোজিট কিংবা অন্যান্য সেভিংস অ্যাকাউন্ট খোলা এবং এর থেকে মুনাফার নামে প্রাপ্ত অর্থ ভোগ করা জায়েজ নয়” বলে ফতোয়া দিয়ে আপনি কি মানুষের উপকার করলেন? নাকি মানুষকে আরো বিপদে ফেললেন (!) এখন মানুষেরা আপনার কথামত, ইসলামী ব্যাংকে টাকা জমা করলেই সুদ হবার ভয়ে ঘরে টাকা রেখে হয় চোর ডাকাতকে আমন্ত্রন জানাবে নতুবা নিরাপদে বাড়ীর পাশে কোনো সুদী ব্যাংকে তা জমা করবে!
আমিও বলছি, কোনো ইসলামী ব্যাংকই শতভাগ শরীয়াহ মানতে পারছে না। সেটা অনেক কিছুর উপর নির্ভর করে। মানতেই হবে, আমাদের দেশটি ইসলামী অনুশাসনে চলে না। এখানকার ব্যাংকিং সিস্টেমও ইসলামিক নয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদভিত্তিক।এরপর ইসলামী ব্যাংকগুলোর নিজেদের মালামাল কেনাবেচার অনুমতি নেই। তাই ওয়াকালা বা প্রতিনিধিত্ব ব্যতিত কোনো উপায়ও নেই। এসব চ্যালেঞ্জকে এড্রেস করে এদেশের ইসলামিক স্কলার, পীর-বুজুর্গ, ফকীহ ও আলেমগণ যে পদ্ধতি প্রক্রিয়া অবলম্বন করলে লেনদেন শরীয়াহসম্মত হয় তা স্থির করে দিয়েছেন।ইসলামী ব্যাংকগুলো তা অনুসরন করে চলে।
এতকিছুর পরও যদি আপনি সন্তুষ্ট হতে না পারেন, সন্দেহ সংশয়ের জীবাণু সংক্রমনের ভয় আপনাকে কুরে কুরে খায় - তাহলে একটি শতভাগ সন্দেহমুক্ত ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা আপনার উপর ফরজ। ইসলামী ব্যাংক পরিচালনার প্রচলিত এই ধারাটি অস্বীকার করলে তার চেয়ে উত্তম কোন ব্যবস্থার চেষ্টা করা আমাদের কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়। মানুষকে কনফিউজড করা অনেক সহজ কিন্তু সমাধান দেয়া কঠিনই বটে। আর বিষয়টা যদি ধর্মীয় কিছু হয় তাহলে তো আরো কঠিন।