11/10/2015
জল-পাথরের খোঁজে.......
সমতলবাসী বাংলাদেশীদের কাছে পাহাড় ও ঝর্ণা, এমনকি সাগরও বরাবরই আবেদন সৃষ্টি করে এসেছে। আর আবেদন সৃষ্টি করার মত এমন কিই বা নেই সেখানে!!! মানব সৃষ্ট সুউচ্চ অট্টালিকা, সাজানো পার্ক হয়ত দেখা যায়, কারো কারো হয়ত সে রকম স্থানসমূহে কাজ এমনকি থাকার সৌভাগ্যও হয়েছে; কিন্তু তাই বলে প্রকৃতি একেবারে ছেড়ে কথা বলবে তেমনটি ভাববারও কোন কারণ নেই। তাইতো প্রতি বছর ভ্রমণপিয়াসুরা বহু টাকা খরচ করে ছুটে চলে বাংলাদেশ এমনকি পৃথিবীর এপ্রান্ত হতে ওপ্রান্তে। কেউ বা যায় পৃথিবীর বিখ্যাত সুদীর্ঘ কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত থেকে শুরু করে কুয়াকাটা, ব্যাংকক, সিঙ্গাপুরের সৈকতে; পার্বত্য চট্টগ্রামের কিওক্রাডং, তাজিওডং, নীলগিরি, সীতাকুন্ড, হিমছড়ি এমনকি সিলেটের জাফলং, মাধবকুণ্ড ঝর্ণা, মাধবপুর লেক, লাউয়াছড়া এবং অবশ্যই এ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের জন্য হামহাম। আর আমি কি এখানে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন মানে সুন্দরবনের কথা বলতে ভুলে গিয়েছি, এমনটি ভাববার কোনই কারণ নেই।
বাংলাদেশে এমন অনেক প্রাকৃতিক শোভামণ্ডিত স্থান রয়েছে যা দেখার জন্য বাংলাদেশীদের চাইতে বিদেশীদের আনাগোনা অনেক বেশি। তাই বলে আবার এমন জায়গাও যে একেবারে খুঁজে পাওয়া যাবে না যা একেবারেই অখ্যাত রয়ে গেছে, এমনকি বাংলাদেশীরাও সে সর্ম্পকে অবগত নয় বিধায় তা বিদেশীদের চোখও এড়িয়ে গেছে।
তবে এখন এমন কি কোন স্থান আছে যা সুবিখ্যাত নয়, আবার একেবারে অপরিচিতও নয় .........
এরকম বহু জায়গা থাকলেও একটি জায়গা আমার মনকে শুধু নয়, আমার ভ্রমণ দলের সবারই মন কেড়ে নিয়েছে। অন্তত কেউ যদি বলে বাংলাদেশ কত সুন্দর হতে পারে তা যদি জানতে চাও তবে যেমন তোমাকে সুন্দরবন, পার্বত্য চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ঘুরতে হবে তেমনি পাহাড়ের ঢালে পাথুরে নদীর বুকে পাথরে বিক্ষিপ্ত ঢেউ এর মাঝে, নদীর বুকে কিশোর-কিশোরীর আনন্দ-উচ্ছ্বাসের মাঝেও আমাদের সোনার বাংলাদেশকে অবশ্যই খুঁজতে হবে, বাংলাদেশেও যে এরকম জায়গা থাকতে পারে তা নিজে না গেলে বিশ্বাসই করা সম্ভব নয়।
আমি সেরকম একটি স্থানের বর্ণনা ইতিমধ্যেই কিঞ্চিত দিয়ে দিয়েছি আগের অংশটুকুতে। কেউ যদি ভেবে থাকেন এগুলো সবই বুলি তবে বিশদ খুলে বলতেই হবে ..........
সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলায় এমনই একটি জায়গা আছে। জায়গাটা কিন্তু একেবারেই দুর্গম নয় এবং সবাই জায়গাটাকে “বিছানিকান্দি” নামেই চেনে। জায়গাটি একেবারে ভারতের সীমান্ত ঘেঁষা, এতই সীমান্ত ঘেঁষা যে স্থানীয়দের ভাষ্যমতে ভারতীয় বাজারটি পুরোপুরিই বাংলাদেশ নির্ভর।
বিছানিকান্দি যেতে হলে সিলেট শহর হতে রেন্ট-এ-কার কিংবা সিএনজি নিলেই চলবে। গাড়িতে প্রায় দুই ঘণ্টার মত পথ পাড়ি দিয়ে গোয়াইনঘাটের হাদারপাড়ের উপরগ্রাম বাজারে পৌঁছুতে হবে। গাড়ি এ পর্যন্তই যাবে। এরপরের রাস্তা ভালো না হওয়ায় পায়ে হেঁটে প্রায় ৪৫ মিনিট হতে এক ঘণ্টার পথ অতিক্রম করে গন্ত্যবে যেতে হবে, অথবা হাদারপার অর্থাৎ উপরগ্রাম বাজার হতে ট্রলার ভাড়া করেও সময় বাচিঁয়ে এবং নৌকাভ্রমণ করেও পৌঁছানো সম্ভব।
হেঁটে কিংবা নৌকায় করে যেভাবে করে পৌঁছানো হোক না কেন স্থানীয় জনপদকে খুব ভালো করে অবলোকন করা সম্ভব। দরিদ্র এ জনপদটির জীবিকার অন্যতম মাধ্যম হলো পাথর আহরণ করা। নদীর দুই ধার ধরে সারি করে সাজানো অবস্থায় দেখা যাবে স্তূপকৃত পাথরসমূহ যা উপরগ্রাম বাজার হতে শুরু করে জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত বিস্তৃত। তবে যে কেউই স্তূপকৃত পাথরের উপস্থিতি সত্ত্বেও স্থানীয় প্রাকৃতিক সৌর্ন্দয খুব ভালোভাবে উপভোগ করতে পারবে। নদীর পাড় ধরে সারি সারি গাছ, তার ফাঁকে ফাঁকে মেঠোরাস্তা, ছোট-বড় অসংখ্য নৌকা, কৈশরের দুরন্তপণা, নদীতে মাছ ধরা, মেঘলা দিনে আকাশের বিচিত্র সব রূপ, দূর পাহাড়ের আবছা অবয়ব সবকিছুই দেখা সম্ভব। এতো হলো শুধু রাস্তার বর্ণনা, আর মূল স্থানটি হচ্ছে ঠিক পাহাড়ের পাদদেশে। দুইপাশে পাহাড় আর মাঝখানে জলপ্রবাহ, নদীর বুকে অসংখ্য পাথর। পাহাড়ী ঢলের পাথরে আছড়ে পড়ে বিক্ষিপ্ত স্রোতধারাও মন্ত্রমুগ্ধকর।
যতই কাছে যাওয়া যায় ততই আরো যেতে ইচ্ছে করে। সারিবদ্ধ পাহাড়সমূহের হাতছানি শুধু্ই কাছে ডেকে যাবে, কিন্তু তার সবগুলোই জিরো পয়েন্টের ওপাশে। তাই জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত গিয়েই ক্ষান্ত দিতে হবে। তবে পাথর ব্যবসায়ীদের কারণে দুই অংশেই পাথরকে আর প্রাকৃতিকভাবে দেখা যায় না, যেটুকু অবলোকন করার সুযোগ রয়েছে, তা শুধুমাত্র জিরো পয়েন্টেই। এখানে চাইলেই পানিতে নেমে পা ভিজানো যায়, তবে কোমর পানিতে ডুবে না গেলেও স্রোতের ধাক্কায় মাঝে মাঝে তলিয়ে যেতেই হবে। সাঁতার জানা না জানা এখানে সমান, পাথরের কারণে এখানে কোমর পানিতে শুধু কোন পাথরকে আঁকড়ে ধরে ভেসে থাকাই সম্ভব ছেড়ে দিলেই তো সর্বনাশ, হয়তো গিয়ে আছড়ে পড়তে হবে অন্য কোন পাথরের উপর, আর হাত পা নাড়ানো কষ্টসাধ্য এবং পাহাড়ী ঢলের বিরুদ্ধে রীতিমত যুদ্ধ করেই পরাজয় মেনে নিতে হবে। তবে পাথরের সাথে গা এলিয়ে পানিতে ভিজে জলের মধ্যে বসে থেকে এখানে নির্দ্বিধায় কাটিয়ে দেয়া যাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কাউকে তো আবার বড় আকারের পাথরের উপর দাঁড়াতেও দেখা যায়। এখান থেকে ঝর্ণা খুব কাছ থেকে দেখা না গেলেও স্রোতের শব্দ ও প্রবাহ সবকিছুই ভুলিয়ে দিবে। আয়েশী ভঙ্গিতে পানিতে সময় কাটানো, পাথর আঁকড়ে ধরা সবকিছুই দিবে এক অনন্য সময় কাটানোর অভিজ্ঞতা। যে কাউকেই অন্তত একটি দিনের জন্য হলেও নিয়ে যাবে অন্য এক শান্ত কোলাহলমুক্ত নিরিবিলি পরিবেশে। শহুরে ব্যস্ততাকে পাশ কাটিয়ে, প্রকৃতির এক অপার নয়নাভিরাম সৌর্ন্দয এক শান্ত জনপদের কাছে।
এখানে ঘুরতে গেলে খাবার ও পানীয় নিয়ে খুব বেশি দুশ্চিন্তা না করলেও চলবে। উপরগ্রাম বাজার হতেই কিনতে পাওয়া যাবে। এমনকি কেউ যদি ঘুরা শেষ করে দুপুরবেলাও ফিরে আসে তবে বাজারেই খেয়ে নিতে পারবে। এখানে ঘুরতে গেলে গাড়ি যাওয়া-আসার জন্য ঠিক করে সারাদিনের জন্য নিয়ে নেওয়াই ভালো। আর অবশ্যই পানি কম থাকা অবস্থায় গেলে পাথরের সাথে ভিজা যাবে, যা ভরা বর্ষায় খুবই বিপদ্দজনক হয়ে উঠতে পারে।
বিছানাকান্দি এখনও অখ্যাত রয়ে যাওয়ায় কোলাহলহীনভাবে ভ্রমণ করা যায়। তাই কারো কাছে সুন্দর ভ্রমণ স্থান নিয়ে নতুন কোন জায়গাকে পরিচিত করাতে চাইলে বিছানাকান্দি অন্তত একবার ঘুরে আসা উচিত। তবে সকলেরই মনে রাখা উচিত আমরা অতিথিমাত্র, তাই পরিবেশ ও জনপদ যাতে দৈনন্দিন কাজকর্ম থেকে বিচ্যুত না হয় এমন কাজ ভ্রমণের সময় না ঘটে।
মোঃ রাকিব হোসেন খান আবির
সদস্য
নেচার স্টাডি সোসাইটি অব বাংলাদেশ