12/12/2025
বছর ঘুরে আবার এলো ডিসেম্বর মাস।
ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে ব্যাংকের গ্রাহকদের আহাজারি শোনা যায় বাতাসে কান পাতলেই-
অমুক ব্যাংক আমার সব টাকা কেটে নিছে!👹
অমুক ব্যাংক ডাকাত!😡
অমুক ব্যাংকের গলাকাটা চার্জ!👺
শালার ব্যাংকে আর টাকাই রাখবো না!😈
ব্যাংক কি আসলেই অনেক বেশি চার্জ কাটে?🤔
ব্যাংক গ্রাহকের কাছ থেকে চার্জ কাটে শিডিউল অব চার্জ মেনে। সব ব্যাংকের ওয়েবসাইটে সেই ব্যাংকের শিডিউল অব চার্জ দেয়া আছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটেও সব ব্যাংকের শিডিউল অব চার্জ আপডেট করা থাকে। আপনি সহজেই খুঁজে নিতে পারেন। Schedule of Charge of 'X' Bank লিখে সার্চ দেন...।
বেশিরভাগ গ্রাহক যেহেতু ব্যাংকে সেভিংস একাউন্ট মেইনটেইন করেন, সেভিংস একাউন্টের চার্জের কথাই বলি:
ব্যাংক সেভিংস একাউন্টে বছরে দুইবার 'একাউন্ট মেইনটেইন্যান্স' চার্জ কাটে। একবার জুনে, একবার ডিসেম্বরে।
একাউন্ট মেইনটেইন্যান্স চার্জ কতো হবে- সেটা নির্ভর করে আপনার একাউন্টের গড় ব্যালান্স এর ওপর।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা মোতাবেক, আপনার একাউন্টে গড় ব্যালান্স যদি ৫,০০০ টাকার কম হয় আপনাকে কোনো একাউন্ট মেইনটেইন্যান্স চার্জ দিতে হবে না। আবার গড় ব্যালান্স ২৫,০০০ টাকার কম হলে ব্যাংক আপনার কাছ থেকে ১০০ টাকার বেশি একাউন্ট মেইনটেইন্যান্স চার্জ আদায় করতে পারবে না।
একাউন্টের গড় ব্যালান্স ২৫,০০০ টাকার বেশি হলে ব্যাংক তার শিডিউল অব চার্জ মোতাবেক একাউন্ট মেইনটেইন্যান্স চার্জ আদায় করবে। এই চার্জের সাথে ১৫% ভ্যাট প্রযোজ্য।
গড় ব্যালান্স যতো বাড়বে, একাউন্ট মেইনটেন্যান্স চার্জ এর মিটার কিন্তু ততোই চড়তে থাকবে।
একাউন্ট মেইনটেইন্যান্স চার্জ এর পাশাপাশি এখন বেশিরভাগ ব্যাংক বছরে দুইবার 'এসএমএস এলার্ট ফি' আদায় করে। এই ফি কোনো ব্যাংকে ১০০ টাকা, কোনো ব্যাংকে ২০০ টাকা। এটার সাথেও ১৫% ভ্যাট আছে, ১০০ মানে ১১৫ আর ২০০ মানে ২৩০।
আপনি যদি একাউন্টের বিপরীতে ডেবিট কার্ড নেন, তাহলে আপনাকে ডেবিট কার্ড এর মেইনটেইন্যান্স ফিও দিতে হবে। বেশিরভাগ ব্যাংক বছরে দুইবার এই চার্জ নেয়। ২০০ টাকা থেকে শুরু হয় ডেবিট কার্ড এর অর্ধবার্ষিক চার্জ। এর সাথে ১৫% ভ্যাট।
বেশিরভাগ ব্যাংকের ইন্টারনেট ব্যাংকিং কিংবা এপ ব্যাংকিং অবশ্য চার্জমুক্ত।
আরেকটা চার্জ কাটে ব্যাংক- আবগারি শুল্ক। এটা অবশ্য সারা বছরে একবারই কাটে, ডিসেম্বরে। ডিসেম্বরের আগে যদি আপনি একাউন্ট বন্ধ করে দেন, একাউন্ট বন্ধ করার সময় আবগারি শুল্ক কাটা হবে।
আবগারি শুল্কের টাকা কিন্তু ব্যাংক পায়না, এটা সরকারের চার্জ। গ্রাহকের কাছ থেকে আদায় করে ব্যাংক এই টাকা সরকারের কোষাগারে জমা দেয়।
আবগারি শুল্ক নির্ধারিত হয় আপনার একাউন্টে বছরের যেকোনো পয়েন্ট অব টাইমে হাইয়েস্ট ব্যালান্স এর ওপর। এক সেকেন্ডের জন্যও যদি আপনার একাউন্টে স্ল্যাবের মধ্যে এমাউন্ট জমা হয়, তাহলে আপনাকে নির্ধারিত হারে আবগারি শুল্ক দিতে হবে।
আবগারি শুল্কের স্ল্যাব এরকম-
সর্বোচ্চ ব্যালান্স তিন লাখ টাকা পর্যন্ত - শুন্য, কোনো আবগারি শুল্ক নেই। (এই অঙ্ক আগের বাজেট পর্যন্ত ১ লাখ ছিলো। এ বছর সরকার দয়াপরবশ হয়ে এ বছরের বাজেটে এই এমাউন্ট বাড়িয়ে তিন লাখ করেছে। ইন্টেরিম সরকার এর জন্য একটা ধন্যবাদ পেতে পারেন।)
সর্বোচ্চ ব্যালান্স তিন লাখ এক টাকা থেকে পাঁচ লাখ পর্যন্ত - ১৫০ টাকা।
সর্বোচ্চ ব্যালান্স পাঁচ লাখ এক টাকা থেকে ১০ লাখ পর্যন্ত- ৫০০ টাকা।
সর্বোচ্চ ব্যালান্স দশ লাখ এক টাকা থেকে পঞ্চাশ লাখ পর্যন্ত- ৩,০০০ টাকা!
সর্বোচ্চ ব্যালান্স পঞ্চাশ লাখ এক টাকা থেকে এক কোটি পর্যন্ত- ৫,০০০ টাকা!!
সর্বোচ্চ ব্যালান্স এক কোটি এক টাকা থেকে দুই কোটি পর্যন্ত- ১০,০০০ টাকা।
সর্বোচ্চ ব্যালান্স দুই কোটি এক টাকা থেকে পাঁচ কোটি পর্যন্ত- ২০,০০০ টাকা।
সর্বোচ্চ ব্যালান্স পাঁচ কোটির উপরে- ৫০,০০০ টাকা।
আবগারি শুল্কের আরেক নাম 'পাপ কর'। ধনী হওয়া একটা বড়সড় পাপ। এই পাপের খেসারত দেবেন অধিক হারে আবগারি শুল্ক দিয়ে।
আপনার একাউন্টে কেউ একজন ১০ লাখ টাকা পাঠিয়েছে, সেই টাকা উইথড্র করে আপনি তার মনোনীত মানুষকে দিয়ে দিয়েছেন ঘন্টাখানেকের মধ্যেই। ব্যস! আপনি পড়ে গেলেন ৩,০০০ টাকা আবগারি শুল্কের জরিমানার মধ্যে 🙄।
আপনি একটা পারসোনাল লোন নিয়েছেন দশ লাখ টাকার। আপনার লোন একাউন্ট ডেবিট করে সেই টাকা আপনার সেভিংস একাউন্টে ক্রেডিট হয়েছে। এইবার আপনার জরিমানা ৬,০০০ টাকা, দুই একাউন্টে ৩,০০০ টাকা করে!🫣
আগে আবগারি শুল্ক শুধু ডিপোজিট একাউন্টে চার্জ হতো। শেখ হাসিনার উন্নয়নের সরকারের উন্নয়ন খরচ মেটাতে লোন একাউন্টেও আবগারি শুল্ক আরোপ করা হয়। সাল তারিখ খুব ভালো মনে নেই আমার, যতোদূর সম্ভব ২০১৮ সালের বাজেটে এই চার্জ আরোপ করা হয়।
চার্জ কি দিতেই হবে? মাফ পাওয়ার কোনো উপায় আছে?
গরীবদের জন্য চার্জ দেয়া থেকে মাফ পাওয়ার একটা বুদ্ধি আপাতত আছে, (সব ব্যাংকে নয়, কিছু ব্যাংকে)- একাউন্টে টাকা না রাখা, কিংবা জুন কিংবা ডিসেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে সব টাকা তুলে ফেলা। ইদানিং কিছু ব্যাংক অবশ্য ডিসেম্বরের শুরু থেকেই চার্জ কাটা শুরু করে।
সব ব্যাংকে এই সুযোগ নাই, কারণ অনেক ব্যাংকে মিনিমাম ব্যালান্স রিকোয়ারমেন্ট আছে। সব টাকা তোলা যায়না। ৫০০/১,০০০/৫,০০০ টাকা রেখে বাকি টাকা তুলতে দেয়।
কিছু পশ ব্যাংকে এই রিকোয়ারমেন্ট লাখ টাকাও ছাড়িয়ে যায়। সেগুলো অবশ্য বড়লোকদের ব্যাপারস্যাপার। প্রিভিলেজড ব্যাংক একাউন্ট। উনারা বিশেষ সেবা পান। ডেডিকেটেড সুন্দরী রিলেশনশিপ ম্যানেজার, লাউঞ্জ, হেভি খাতির...। আমরা যারা গরীব মানুষ, বড়লোকের কিচ্ছা শুনে তাদের কাজ নেই।
জ্বালার কথা হচ্ছে, আপনার একাউন্টে ব্যালান্স না থাকলেও চার্জ কেটে নেয় অনেক ব্যাংক, আপনার একাউন্টের ওয়ার্কিং ব্যালান্স নেগেটিভ করে রাখে।
পরবর্তীতে যখনই আপনি টাকা জমা দেবেন, ওই পরিমাণ টাকা স্রেফ হাপিশ হয়ে যাবে।
আরো জ্বালার কথা হলো, এখন যেসব ব্যাংকে টাকা না রেখে চার্জ মাফ পাওয়া যাচ্ছে এখন, অদূর ভবিষ্যতে তারাও এই একাউন্ট নেগেটিভ করে রাখার বুদ্ধি অবলম্বন করার প্ল্যান করছে।
জ্বালার কথা শুনলেন, সুখের কথাটাও শোনেন একটু- ব্যাংক সেভিংস একাউন্টে যৎকিঞ্চিৎ ইন্টারেস্টও দেয়।
সেভিংস একাউন্টে ইন্টারেস্ট জমা হয় বছরে দুইবার- জুনে আর ডিসেম্বরে।
বিশ্বাস হচ্ছেনা? ব্যাংক সেভিংস একাউন্টে ইন্টারেস্ট দেয়, সত্যিই দেয়। হারটা নগণ্য বলে আপনাদের অনেকের চোখ এড়িয়ে গেছে হয়তো। বর্তমানে এই হার ২.৫% থেকে ৪%।
ভালো কথা, এই ইন্টারেস্ট এমাউন্ট থেকে আবার সোর্স ট্যাক্স কেটে নেয় ব্যাংক। আপনার টিন থাকলে ১০% হারে আর টিন না থাকলে ১৫% হারে সোর্স ট্যাক্স কেটে রাখে। এই টিন কিন্তু ঘরের চালের টিন নয়, TIN (Tax Identification Number)।
সম্প্রতি সরকার নিয়ম আরো কঠিন করেছে। শুধু টিন থাকলেই চলবে না, হ্রাসকৃত হারে (১০%) সোর্স ট্যাক্স কাটানোর সুবিধা পেতে হলে আপনাকে ট্যাক্স রিটার্ন প্রদানের প্রমাণ (রিসিপ্ট/সার্টিফিকেট) ব্যাংকে জমা দিতে হবে।
ট্যাক্স জমা দিয়ে থাকলে দ্রুত ব্যাংকে যোগাযোগ করে রিসিপ্ট কিংবা সার্টিফিকেট এর কপি জমা দিন। একবার ১৫% হারে ট্যাক্স কেটে ফেললে সেটা আর ফেরত দেয়না বেশিরভাগ ব্যাংক।
তবে, বেশিরভাগ একাউন্টহোল্ডারই এই ইন্টারেস্ট পাননা। কেউ কেউ পান, অঙ্কটা মেলাতে পারেন না। কেনো পাননা? কেনো অঙ্ক মেলেনা? আসুন এই দুই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে দেখি...
সেভিংস একাউন্টে ইন্টারেস্ট পেতে হলে শর্ত মোটামুটি দুইটাঃ
১. এক সপ্তাহে দুইটার বেশি চেক কাটা যাবেনা।
২. এক চেকে মোট ব্যালান্সের ২৫% এর বেশি টাকা তোলা যাবেনা।
প্রথম শর্তটাকে একটু মডিফাই করে নিয়েছে অনেক ব্যাংক। শুধু চেক কাটা নয়, যেকোনো ভাবে (কার্ড, ইএফটি, এনপিএস, আরটিজিএস, ট্রান্সফার, অনলাইন পেমেন্ট) সপ্তাহে দুইবার টাকা তোলা যাবেনা।
দ্বিতীয় শর্তের ক্ষেত্রেও, একটা উইথড্রয়াল (যেকোনো মাধ্যমে) মোট ব্যালান্সের ২৫% এর বেশী হতে পারবেনা।
এখন, যদি কোনো এক মাসে আপনি এই দুই শর্তের কোনো একটা ভাঙেন, আপনি সেই মাসের জন্য এক টাকাও ইন্টারেস্ট পাবেন না।
শর্তের কথা জানলেন, হিসাবায়ন হয় কেমন করে?
ব্যাংক তিনভাবে ইন্টারেস্ট ক্যালকুলেট করে:
১. ডেইলি ব্যালান্সের ওপর
২. এভারেজ মান্থলি ব্যালান্সের ওপর
৩. মিনিমাম মান্থলি ব্যালান্সের ওপর
দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, সেভিংস একাউন্টে ইন্টারেস্ট দেবার বেলায় তিন নম্বর পদ্ধতিটাই বেছে নিয়েছে বেশিরভাগ ব্যাংক। কারণ, এই পদ্ধতিতে ব্যাংকের খরচ সর্বনিম্ন।
উদাহরণ দিই একটা- মাসের এক তারিখে আপনার একাউন্টে পাঁচশো টাকা ছিলো, দুই তারিখে আপনি এক কোটি টাকা জমা দিলেন, সারা মাস আর টাকা তুললেন না। ব্যাংক কিন্তু ওই মাসের জন্য আপনাকে পাঁচশো টাকার ওপর ২.৫%-৪% হারে ইন্টারেস্ট দিবে।
অবশ্য, গ্রাহক আকর্ষণ করতে কিছু ব্যাংক ইদানিং সেভিংস একাউন্টেও আকর্ষণীয় মুনাফা এবং সুবিধাদি দিচ্ছে।
শেষে একটা কথা বলি- আমি যদি কোনো ব্যাংকের এমডি হই, সেই ব্যাংকে কোনো একাউন্ট মেইনটেন্যান্স চার্জ থাকবে না, থাকবেনা এসএমএস এলার্ট চার্জ।