01/05/2025
আমরা ইতোমধ্যে শিখে গেছি, ক্রেতার অনুরোধে বিক্রেতার বরাবরে ব্যাংক যে পেমেন্ট আন্ডারটেকিং দেয় তাকে এলসি বলে।
আমরা আরও শিখেছি যে, ব্যাংক ক্রেতার পক্ষ থেকে পেমেন্ট দেবে- এই নিশ্চয়তা দেবার আগেই ক্রেতা কখন, কীভাবে ব্যাংককে টাকা দেবে সেটা ঠিক করে রাখে।
তাহলে, এলসির ভূমিকা হলো বাণিজ্যে মধ্যস্থতা করা। বাণিজ্য বলতে মূলতঃ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ই। তবে, আভ্যন্তরীণ বাণিজ্যেও এলসির ব্যবহার দেখা যায়। এমনকি ইপিজেড থেকে দেশের মধ্যে আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রেও এলসির ব্যবহার হয়।
এবার একটু পেছন দিকে যাই। বাণিজ্য ব্যাপারটা শুরু হয় কোথা থেকে?
একজন ব্যবসায়ী যখন তার ব্যবসার জন্য পণ্য কেনার সিদ্ধান্ত নেন, তখন হয় বাণিজ্যের গোড়াপত্তন।
এরপর সেই ব্যবসায়ী সাপ্লায়ার খোঁজেন। উপযুক্ত সাপ্লায়ার পাওয়ার পর, তার সাথে ডিল করেন। এই যে কেনাবেচা, এর নানা খুঁটিনাটি আছে। এই কেনাবেচার প্রধান দুইটা আসপেক্ট হলো দাম আর পেমেন্ট মেথড।
পণ্যের ইউনিট অব মেজারমেন্ট আর ইউনিট প্রাইস ঠিক হয় ক্রেতা-বিক্রেতার মিউচুয়াল বার্গেইনিং এর মাধ্যমে। দুইজনই উইন খোঁজেন। শেষমেশ একটা রফা হয়। এরপরে নির্ধারিত হয় সুবিধাজনক পেমেন্ট মেথড (ওপেন একাউন্ট, এডভান্স পেমেন্ট, ডকুমেন্টারি কালেকশন, এলসি)। ক্রেতা-বিক্রেতার বার্গেইনিং পাওয়ার এটা নির্ধারণে ভূমিকা রাখে।
অন্য খুঁটিনাটিগুলো শুনবেন? শোনেন তাহলে...।
পণ্যের বিস্তারিত: পণ্যের বিস্তারিত স্পেসিফিকেশন খুব জরুরী। একজন ব্যবসায়ীর এটা জানা খুব প্রয়োজন। তিনি কী পণ্য কিনছেন, সেই পণ্য তার টার্গেটেড গোল পূরণ করবে কি না, সেটা না জানলে তার আর ব্যবসা করে খেতে হবে না।
পণ্যের স্পেসিফিকেশন ঠিক করে দেয়ার জন্য পৃথিবীব্যাপী চালু আছে এইচ এস কোড। এইচ এস এর পূর্ণরুপ হলো- হারমোনাইজড সিস্টেম কোড। সংখ্যা দিয়ে প্রকাশিত এইচ এস কোড দ্বারা পণ্যের বৈশিষ্ট্য, গুণাগুন এবং এর ওপর প্রযোজ্য ভ্যাট-ট্যাক্স-ডিউটি নির্দিষ্ট করা হয়।
কান্ট্রি অব অরিজিন: পণ্যটা কোন দেশে উৎপাদন হয়েছে, এটা জানা দরকার।
পণ্যটা কিসে পাঠানো হবে? কুরিয়ারে/ট্রাকে/জাহাজে/উড়োজাহাজে/অন্য কোনো উপায়ে? এটাকে কেতাবে বলা আছে 'মোড অব ট্রান্সপোর্ট'। মোড অব ট্রান্সপোর্ট শুধু যে একটা হবে, তা কিন্তু নয়। একাধিক মোডও হতে পারে।
পণ্যটা কবে পাঠানো হবে? এটাকে কেতাবি ভাষায় বলে 'ডেট অব শিপমেন্ট' অথবা 'লাস্ট ডেট অব শিপমেন্ট'। বিক্রেতা নির্দিষ্ট সময়ের পর পণ্য শিপমেন্ট করলে সেটা ডেলিভারি নিতে অস্বীকার করার কিংবা ক্ষতিপূরণ দাবি করার অধিকার ক্রেতার আছে। ব্যাংকেরও পেমেন্ট দেবার বাধ্যবাধকতা থাকেনা এরকম ক্ষেত্রে।
আরো যেসব বিষয়ে ক্লিয়ার হওয়া প্রয়োজন, সেগুলো হলো-
১. পণ্যটা কীভাবে প্যাকিং হবে? কে প্যাকিং করবে?
২. বিক্রেতার ফ্যাক্টরি থেকে মালামাল লোড করার চার্জ কে দেবে?
৩. বিক্রেতার ফ্যাক্টরি থেকে পোর্ট পর্যন্ত ভাড়া এবং পোর্টে আনলোডিং চার্জ কে দেব?
৪. বিক্রেতার দেশের পোর্টের ডিউটি, ট্যাক্স এবং কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স চার্জ কে দেবে?
৫. বিক্রেতার দেশের টার্মিনালের চার্জ কে দেবে?
৬. বিক্রেতার দেশে ট্রাক/জাহাজ/উড়োজাহাজ/অন্য বাহনে লোডিং চার্জ কে দেবে?
৭. ট্রাক/জাহাজ/উড়োজাহাজ/অন্য বাহনের ভাড়া কে দেবে? (এটাকে বলে ফ্রেইট)
৮. ইন্স্যুরেন্সের চার্জ কে দেবে?
৯. ক্রেতার দেশের টার্মিনালের চার্জ কে দেবে?
১০. ক্রেতার ফ্যাক্টরি পর্যন্ত মালামাল পৌঁছানোর খরচ কে দেবে?
১১. ক্রেতার ফ্যাক্টরিতে আনলোডিং এর চার্জ কে দেবে?
১২. ক্রেতার দেশের পোর্টের ডিউটি, ট্যাক্স এবং কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স চার্জ কে দেবে?
এই ১২ টার সাথে আরো দুইটা ব্যাপার আছে- ফ্রেইট কী প্রিপেইড হবে, না পোস্টপেইড?
সবচেয়ে ইম্পর্ট্যান্ট হলো, এই যে পণ্য পরিববহনের ঝুঁকি, এইটা কতোক্ষণ পর্যন্ত বিক্রেতার ঘাড়ে থাকবে, কখন ক্রেতার ঘাড়ে ট্রান্সফার হবে?
এই ১৪টি বিষয় সুরাহা করার জন্য আন্তর্জাতিক কিছু নিয়মকানুন আছে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এই নিয়মগুলোকে বলা হয় 'ইনকোটার্মস'। পূর্ণরুপ হলো ইন্টারন্যাশনাল কমার্শিয়াল টার্মস। একেকটা তিন ক্যাপিটাল লেটারের ( EXW, FCA, FAS, FOB, CFR, CIF, CPT, CIP, DAP, DPU, DDP) ইনকোটার্ম দিয়ে এই ১৪টা ইস্যু মিটমাট করে ফেলা যায়।
আপনারা কখনো শুনেছেন কোনো ইনকোটার্ম? শুনেছেন বোধহয়😃। এফওবি শোনেননি? সিএফআর? আচ্ছা, না শুনলে নাই। তবে, ১১টা ইনকোটার্ম এর মধ্যে যেকোনো একটাতে ঐক্যমতে পৌঁছে ক্রেতা আর বিক্রেতা- এইটুকু জেনে রাখুন। বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানিতে কোন ইনকোটার্ম ব্যবহার হবে, কোনটা হবেনা- সে ব্যাপারে সরকারের নির্দেশনা আছে।
এই সবগুলো ব্যাপারে ফয়সালা হবার পর বিক্রেতা ক্রেতাকে একটা প্রাথমিক লিখিত অফার দেন। এটা ক্রেতা 'একসেপ্ট' করলে তখন 'অফার-একসেপ্টেন্স' মিলে হয়ে যায় একটা চুক্তি বা কন্ট্রাক্ট। এই কনট্রাক্ট এর একটা সুন্দর নাম আছে- 'প্রোফর্মা ইনভয়েস'।