14/10/2025
গল্প : নিথর ছায়া ও একটি নিখোঁজ ডায়েরি।
সেদিন রাত ছিল থমথমে। আকাশে চাঁদ থাকলেও মেঘের আড়ালে ঢাকা, যেন এক লুকানো রহস্যের সাক্ষী। শহরের এক অভিজাত এলাকার পুরাতন বাড়ি 'শান্তি নিবাস'-এর বিশাল হলরুমে ডিটেকটিভ অভ্র চৌধুরী স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে। হলরুমের মাঝখানে একটি দামি পার্সিয়ান কার্পেটের ওপর একটি নিথর দেহ পড়ে আছে। প্রবীণ শিল্পপতি সমরেশ লাহিড়ী। তার বুকে একটি মাত্র ছুরির আঘাত, আর মেঝেতে রক্তের গাঢ় ছাপ।
অভ্র চারপাশটা খুঁটিয়ে দেখল। বাইরে থেকে দরজা-জানালার কোনো চিহ্ন নেই, তার মানে হত্যাকারী ভেতরের কেউ। ঘরটি আসবাবপত্রে ঠাসা, কিন্তু কোনো কিছুই এলোমেলো নেই, যা থেকে বোঝা যায় প্রতিরোধ করার কোনো সুযোগ পাননি সমরেশবাবু।
তবে একটি জিনিস অভ্রর চোখে পড়ল – একটি ছোট, কালো লেদারের ডায়েরি যেখানে থাকার কথা ছিল, সেখানে নেই। অভ্র জানতে পেরেছিল, সমরেশ লাহিড়ী নিয়মিত একটি ডায়েরিতে তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, বিশেষত গত কয়েক বছরে তার ব্যবসা ও ব্যক্তিগত জীবনের কিছু 'স্পর্শকাতর' বিষয় লিখে রাখতেন। ডায়েরিটি সবসময় তার এই স্টাডিরুমের গোপন সিন্দুকে থাকত। কিন্তু সিন্দুকটি খোলা, আর ডায়েরিটি উধাও।
অভ্রর তদন্ত শুরু হলো। প্রথম সন্দেহ সমরেশবাবুর একমাত্র ছেলে, প্রতীক লাহিড়ী। প্রতীকের সাথে বাবার সম্পর্ক ভালো ছিল না, কারণ প্রতীক পারিবারিক ব্যবসায়ে নয়, বরং নিজের একটি আর্ট গ্যালারি নিয়ে ব্যস্ত থাকতে চাইত। আর্থিক কারণেও তাদের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ ছিল। প্রতীক ঘটনার সময় শহরে থাকলেও তার alibi (অন্যত্র থাকার প্রমাণ) মজবুত ছিল।
দ্বিতীয় সন্দেহ সমরেশবাবুর তরুণী স্ত্রী, ঈশিতা লাহিড়ী। সমরেশবাবু তার চেয়ে প্রায় তিরিশ বছরের বড় ছিলেন। ঈশিতাকে সম্পত্তির লোভে বিয়ে করার অভিযোগ ছিল প্রতিবেশীদের। ঈশিতা জানালো, ঘটনার সময় তিনি ঘুমের ওষুধ খেয়ে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলেন। তার ঘরে ওষুধের শিশি পাওয়া গেল।
অভ্র ডায়েরিটির ওপর নজর দিল। কেন একজন খুনি শুধুমাত্র ডায়েরিটি নিতে চাইবে? ডায়েরিতে কী এমন রহস্য লুকানো ছিল, যা সমরেশবাবুকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিল?
তদন্ত চলাকালে অভ্র জানতে পারে, সমরেশ লাহিড়ী সম্প্রতি একটি বিতর্কিত জমি চুক্তির সাথে জড়িত ছিলেন, যার ফলে স্থানীয় এক শক্তিশালী রাজনৈতিক নেতার সাথে তার বড়সড় ঝামেলা হচ্ছিল। সেই নেতা, যার নাম অরিন্দম সেন, এই ঘটনার দু'দিন আগে সমরেশবাবুকে প্রকাশ্যে হুমকিও দিয়েছিলেন।
অভ্র অরিন্দম সেনের আস্তানায় গেল। অরিন্দম সেন তার অফিসে বসেছিলেন, নির্লিপ্ত। অভ্রর প্রশ্নের জবাবে তিনি স্বীকার করলেন যে তার সাথে সমরেশবাবুর ঝামেলা ছিল, কিন্তু খুন করার মতো কারণ ছিল না। তিনি উল্টো অভ্রকে একটি পুরানো খবরের কাগজের ক্লিপিং দেখালেন। ক্লিপিংটিতে সমরেশ লাহিড়ীর প্রথম স্ত্রীর রহস্যজনক আত্মহত্যার খবর ছিল, যা ২০ বছর আগের ঘটনা। পুলিশ সেটিকে আত্মহত্যা বলে ঘোষণা করলেও অনেকের সন্দেহ ছিল।
অভ্র 'শান্তি নিবাস'-এ ফিরে এসে আবার সবকিছু খতিয়ে দেখল। তার মনে হলো, খুনি সমরেশবাবুর পরিচিত কেউ, যে ডায়েরির কথা জানত। কিন্তু খুনিকে কেন ডায়েরিটা চুরি করতে হবে? যদি সে বাইরের কেউ হতো, তবে তো সে সিন্দুকে থাকা টাকা বা অলঙ্কারও নিতে পারত।
হঠাৎ অভ্রর মনে পড়ল ঈশিতার কথা। সে বলেছিল ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়েছিল। কিন্তু অভ্র খেয়াল করেছিল, ঈশিতার চোখে সামান্য জল শুকানোর দাগ ছিল। একজন মানুষ যদি ঘুমের ওষুধ খেয়ে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকে, তবে তার পক্ষে তার স্বামীর হত্যা হওয়া বা তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করার কোনো স্মৃতি থাকার কথা নয়।
অভ্র পরদিন ঈশিতাকে ডেকে পাঠালো। "ঈশিতা দেবী," অভ্র শান্ত গলায় শুরু করল, "আপনি কি নিশ্চিত যে ডায়েরিটি সিন্দুকেই থাকত? আর আপনি সেদিন রাতে সত্যিই ঘুমিয়েছিলেন?"
ঈশিতা ঘাবড়ে গেল না, বরং দৃঢ় কণ্ঠে উত্তর দিল, "আমি যা বলেছি, সব সত্য।"
অভ্র মুচকি হাসল। "আমি জানি খুনি কে, ঈশিতা দেবী। আর ডায়েরিটিও আপনার কাছে আছে।"
ঈশিতার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। অভ্র বলতে শুরু করল, "প্রকৃতপক্ষে, খুনি আপনি নন। খুনি হলো প্রতীক লাহিড়ী।"
ঈশিতা হতবাক! অভ্র ব্যাখ্যা করল: "প্রতীক জানত ডায়েরিটিতে তার বাবার ২০ বছর আগের প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর আসল সত্য লুকিয়ে আছে। তার মা আত্মহত্যা করেননি, তাকে তার বাবা খুন করেছিলেন। ডায়েরিতে সেই স্বীকারোক্তি ছিল। প্রতীক খুন করে ডায়েরিটি সরিয়ে ফেলে যাতে সত্যটা চাপা না পড়ে যায়। কিন্তু সে আপনার ওপর দোষ চাপানোর জন্য একটি কৌশল করেছিল। আপনি যখন ঘুমের ওষুধ খেয়েছিলেন, তখন প্রতীক এসে আপনাকে জাগানোর চেষ্টা করে। আপনি জেগে যান এবং স্বামীকে মৃত দেখে স্বাভাবিকভাবেই কেঁদে ওঠেন। কিন্তু আপনি ভয়ে কাউকে কিছু বলেননি। প্রতীক আপনাকে বোঝায় যে ডায়েরিটা আপনার কাছে রাখলেই বরং আপনার নামে চুরি আর খুনের অপবাদ আসতে পারে। তাই সে নিজেই ডায়েরিটা নিয়ে নেয়।"
ঈশিতা এবার ভেঙে পড়ল। চোখের জলে সবটা স্বীকার করল। প্রতীক বাবার অত্যাচারের কথা শুনে ক্ষোভে খুন করে। ডায়েরিটি সে লুকিয়ে রেখেছিল তার আর্ট গ্যালারিতে, একটি অব্যবহৃত ক্যানভাসের পেছনে।
অভ্র জানতে পারল, ডায়েরিতে লেখা ছিল, সমরেশবাবু তার প্রথম স্ত্রীকে মানসিক নির্যাতন করে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য করেছিলেন। প্রতীক খুনটা করেছিল বাবার সেই পাপের প্রতিশোধ নিতে।
অভ্র যখন প্রতীককে গ্রেপ্তার করতে যায়, তখন সে হাসছিল। তার চোখে কোনো অনুশোচনা ছিল না, ছিল শুধু এক শীতল প্রতিশোধের তৃপ্তি। ডায়েরিটি উদ্ধার হলো, কিন্তু তার ভেতরের রহস্য উন্মোচন করতে গিয়ে আরেকটি ভয়ঙ্কর সত্য সামনে এলো। নিথর ছায়াটার পেছনে ছিল এক সুদীর্ঘ লুকানো পাপের কাহিনি।
রহস্যের শেষ: ডায়েরিটি পাওয়া গেলেও প্রতীক লাহিড়ী কোনো অনুশোচনা দেখায়নি। তার মতে, সে ন্যায়বিচার করেছে। কিন্তু আইন তার এই ব্যক্তিগত প্রতিশোধকে সমর্থন করল না।
গল্পের সমাপ্তি। গল্পটা ভালো লাগলেএকটা লাইক করে যাবেন ❤️